পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের মাস্তুঙের কাছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বহরে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে পাকিস্তানের অন্তত ৪৫ জন সেনা নিহত হয়েছে। বেলুচিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বেলুচিস্তান পোস্ট তাদের অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ইতিমধ্যে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলার ঘটনা নিশ্চিত করলেও এখনো নিহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
বিএলএর মুখপাত্র জিয়ান্দ বেলুচ এক বিবৃতিতে জানান, সংগঠনের যোদ্ধারা পাক নিরাপত্তা বাহিনীর বহর, এসকর্ট লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এ ছাড়া হামলা শুরু হওয়ার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছানো অতিরিক্ত সেনা সদস্যদের ওপরও হামলা চালানোর দাবি করেছে বিএলএ।
জিয়ান্দ বেলুচ দাবি করেছেন, বিএলএর ‘ফাতেহ স্কোয়াড’ এই সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিবৃতি প্রকাশের সময় পর্যন্ত বিএলএ যোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছিল এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
টানা হামলার পর ‘অপারেশন শাবান’
গত সপ্তাহে বেলুচিস্তানের জিয়ারত জেলার মাঙ্গি ড্যাম এলাকায় সমন্বিত জঙ্গি হামলায় ২৭ জন পুলিশ সদস্য এবং লাসবেলা জেলায় ১১ জন সেনা নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রদেশটিতে ‘অপারেশন শাবান’ শুরু করে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাক সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কর্পস ও বেলুচিস্তান পুলিশ যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করছে। এতে গোয়েন্দা সংস্থা ও বিমান সহায়তাও যুক্ত রয়েছে।
এই অভিযানে এখন পর্যন্ত শতাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী নিহত হয়েছে বলে দাবি পাক বাহিনী।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করা হবে এবং জঙ্গিদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সেনাবাহিনীর জবাবে “যুক্তিসঙ্গততা বা আনুপাতিকতার” প্রত্যাশা করা উচিত হবে না।
কেন অস্থির বেলুচিস্তান?
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হলেও সবচেয়ে কম জনবহুল প্রদেশ বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্র। বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং প্রদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য অংশীদারিত্বের দাবিকে ঘিরেই এই বিদ্রোহ গড়ে উঠেছে।
ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে চীনের বিনিয়োগে নির্মিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ গভীর সমুদ্রবন্দর গওয়াদর অবস্থিত, যা চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রচুর খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও একই সঙ্গে এটি দেশের অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
তদন্তে চার সদস্যের কমিটি
পাকিস্তানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ঘটনাক্রম পুনর্গঠন, সম্ভাব্য নেতৃত্বগত ব্যর্থতা, মাঙ্গি ড্যাম এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল কিনা- তা খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুই সপ্তাহে একের পর এক হামলা
গত ৬ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে বেলুচিস্তানে তিনটি বড় হামলা হয়। এর মধ্যে একটি হামলার দায় স্বীকার করে বিএলএ এবং বাকি দুটি চালায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)।
গত ৭ জুলাই টিটিপির একটি হামলা জিম্মি সংকটে রূপ নেয়। সে সময় রাওয়ালপিন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পাক সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানান, একটি চেকপোস্ট দখলের পর টিটিপি ১৮ জন জীবিত পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করে।
পরে সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, জিম্মি করা ওই ১৮ জনকেই হত্যা করা হয়। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি।
এছাড়া গত ৮ জুলাই লাসবেলা জেলার বেলা-উইন্ডার এলাকায় এন-২৫ মহাসড়কের কাছে সেনাবাহিনীর একটি বহরে অতর্কিত হামলা চালানো হয়।
পাক সেনাবাহিনীর দাবি, ওই হামলায় একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারসহ ১১ জন সেনা নিহত হন। এই হামলার জন্য বিএলএকে দায়ী করা হয়।
তবে বিএলএ ভিন্ন দাবি করে জানায়, তারা ওই হামলায় ১৭ জন সেনাকে হত্যা করেছে এবং সেনাবাহিনীর বহর থেকে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম জব্দ করেছে।
তবে বিএলএর এই দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে সম্প্রতি বিএলএ বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া প্রদেশটির ৮৫ শতাংশ অঞ্চল বিএলএ দখল করেছে বলেও খবর চাউর হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা নিরপেক্ষভাবে এখন পর্যন্ত যাচাই করা যায়নি।
