নেতৃত্ব কোনো পদবী বা অবস্থান নয়; এটি হলো একটি দূরদর্শী স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার নিরলস প্রচেষ্টা এবং অন্যের জীবনমানকে উন্নত করার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।" - জন সি. ম্যাক্সওয়েল । জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের "আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি' পচা অতীত, আমাদের চোখে নূতন স্বপ্ন, বুকে নব গীত!" বাংলা কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে দুটি সুর— একদিকে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় থমকে না দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলার আহ্বান, অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখায় ক্ষুধা আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে নতুন এক পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন। এই দুই সুর মিলেই যেন তৈরি হয় একটি জাতির অগ্রযাত্রার পটভূমি— থেমে না থাকা, আর প্রতিটি মানুষের জন্য বাসযোগ্য একটি রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়লাভ করে, আর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তিনি দেশে ফিরে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ঠিক এই সময়েই তার মা ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ঘটে, যা ব্যক্তিগত শোকের পাশাপাশি রাজনৈতিক দায়িত্বকেও আরও ভারী করে তোলে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত আর বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে সরকার যেসব উদ্যোগ হাতে নিয়েছে, তা দেশের কল্যাণে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রাখে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সরকার প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প হাতে নিয়েছে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানিয়েছেন, প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক ও খাতভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে বাস্তবায়িত হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো কোনো সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি, বাজেটে কর-ভ্যাট সুবিধা, কূটনীতি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য-শিক্ষা, তরুণ ও ক্রীড়া উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার-সুশাসন এবং নারী নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা-এই বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৃহীত উদ্যোগগুলোর একটি সামগ্রিক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ: তারেক রহমান সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগগুলোর একটি হলো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির দ্রুত সম্প্রসারণ। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম মাসেই নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে চালু করা হয় 'ফ্যামিলি কার্ড', যার আওতায় ইতিমধ্যে ৫৩ হাজারের বেশি পরিবার সুবিধা পেয়েছে। কৃষকদের জন্য চালু হয়েছে 'ফার্মার্স কার্ড', যার মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার পরিবার কৃষি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে। প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব ও অন্যান্য ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু হয়েছে, যার আওতায় এখন প্রায় ছয় হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধান উপকৃত হচ্ছেন। প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের বাড়তি মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে। পাশাপাশি ৫৫ লাখ পরিবারকে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল সরবরাহের কর্মসূচি চালু রাখা হয়েছে, আর প্রবীণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য মেট্রোরেল ও ট্রেনে ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও সরকার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। নির্বাচনী এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে ঈদ উপলক্ষে শাড়ি, থ্রিপিস ও হাজি রুমাল বিতরণ করা হয়েছে, পাশাপাশি সকল পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্যও ঈদ উপহারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দরিদ্রদের কাছে সম্পদ পৌঁছে দিতে ও কল্যাণমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা চালুরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আর্থিক শৃঙ্খলা: উত্তরাধিকারসূত্রে সরকার যে অর্থনীতি পেয়েছিল, তা ছিল যথেষ্ট কঠিন— উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক খাত আর বিনিয়োগে খরা। তারপরও গত তিন মাসে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। গত ৭ জুলাই পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে, এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে, বাকিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া প্রবাসী আয় নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছে— একক মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা দেশের সর্বোচ্চ অন্যান্য মাসের চেয়ে। প্রবাসীদের জন্য পৃথক 'এক্সপ্যাট্রিয়েট কার্ড' চালুরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আর প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে, যা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তরুণ কর্মশক্তিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে বাস্তবমুখী, উন্নয়নবান্ধব ও জনকল্যাণকেন্দ্রিক বাজেট হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগের অনেক বছরের তুলনায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানকে অধিক অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বাজেটে শিক্ষা খাতে প্রায় ১লাখ ৩৬ হাজার কোটি যা মোট বাজেটের ১৪.৫৬ শতাংশ। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্যে প্রায় ৬৯ হাজার কোটি, কৃষিতে প্রায় ২৮ হাজার কোটি যা মোট বাজেটের ৩.০৮ শতাংশ এবং পরিবহন–যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা টেকসই প্রবৃদ্ধি ও জনকল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।। সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করা—একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু স্পষ্ট দিকনির্দেশনা সম্পন্ন লক্ষ্যমাত্রা ।
বাজেটে জনবান্ধব কর ও ভ্যাট সুবিধা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ক্রিয়েটিভ ইকোনমি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা, নারী ও শিশু কল্যাণ, যোগাযোগ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ খাতে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। এই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি এবং পরিচালনা ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের অর্থ সরাসরি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহারের প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছে সার ও কীটনাশকের ওপর থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট ও কর প্রত্যাহারের মাধ্যমে, যা কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চাল, গম, আলু ও মসলাসহ ৬০ প্রকার নিত্যপণ্যের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, আর দেশে ভোজ্যতেল উৎপাদনে আগামী ১০ বছরের জন্য কোনো কর রাখা হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে ওষুধ তৈরির ৬৮ প্রকার কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে, হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর থেকে ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়া হয়েছে, ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ক্যান্সারের ওষুধের ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হয়েছে।শিল্প ও পরিবহন খাতে ইলেকট্রিক বাস-ট্রাক ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে ৫ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার এবং দেশে তৈরি ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক উৎপাদন কারখানাগুলোর জন্য কর রেয়াত সুবিধা রাখা হয়েছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর কমিয়ে ৪ শতাংশ এবং মোবাইল উৎপাদন কারখানাগুলোর ২২ প্রকার কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে। স্বর্ণালঙ্কার সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ এবং মোবাইল সিমের ওপর থাকা কর সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে, যদিও এর ফলে সরকারের বছরে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হবে। এ ছাড়া প্রসাধনী আমদানির ক্ষেত্রে লিপস্টিকের শুল্ক কমিয়ে প্রতি কেজিতে মাত্র ৩০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানিতে ৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং রপ্তানি আয়ে নগদ প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে করমুক্ত রাখা হয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের বিল পরিশোধে ৫ শতাংশ রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও স্থানীয় অর্থনীতির প্রসার: বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সহজ করতে সরকার একাধিক নীতিগত সংস্কার এনেছে। ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাবাসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রক্রিয়া অনেক সহজ করবে। সব শিল্পকারখানার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ঈদ বোনাস সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা হয়েছে, আর পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বল্প ব্যবহৃত ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, বিসিক এলাকা, হাই-টেক পার্ক ও ইন্ডাস্ট্রি ক্লাস্টারের তালিকা তৈরি করে সেখানে সম্ভাবনাময় ব্যবসা ও স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বিত ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। রমজান ও ঈদের সময় নিত্যপণ্যের বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে, আর বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে স্পট এলএনজি কেনা হয়েছে।
কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতি-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর ছিল মালয়েশিয়া ও চীন। জুন মাসে ছয় দিনের এই সফরে তিনি প্রথমে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন, এরপর চীনে যান প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর আমন্ত্রণে তিন দিনের সরকারি সফরে, যেখানে তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন এবং দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের 'সামার দাভোস'-এ যোগ দেন।মালয়েশিয়া সফরে তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জানান, তার সরকারের অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। তিনি মালয়েশিয়াকে অনুরোধ জানান, ২০২৪ সাল থেকে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার যেন দ্রুত পুনরায় খুলে দেয়া হয় এবং আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়। এর ফলে গত ৭ই জুলাই, ২০২৬ মালয়েশিয়া শ্রমবাজার খুলে দেয়। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ ও আটক বাংলাদেশিদের ফেরত দেয়ার বিষয়েও তিনি আলোচনা করেন। দুই দেশ স্বচ্ছ ও স্বল্প ব্যয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সম্মত হয়, একই সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিনিয়োগ প্রসার, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতার একাধিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় দলিল স্বাক্ষরের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়, যার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদী প্রকল্পও ছিল আলোচ্যসূচিতে। চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের জন্য ৪১ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন টাকার একটি অবকাঠামো প্রকল্পও অনুমোদিত হয়েছে, যা রেয়াতি চীনা ঋণে অর্থায়িত হবে। এই প্রকল্প থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় এক লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ৫০ কোটি ডলারের বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা উন্নত হলেও সীমান্ত সংক্রান্ত জটিলতা এখনো রয়ে গেছে, আর এই প্রেক্ষাপটে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ ঢাকার বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।এ ছাড়া বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে এবং আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) যুক্ত হওয়ারও আগ্রহ দেখিয়েছে। পাসপোর্টে পুনরায় 'ইসরায়েল ব্যতীত' শব্দগুচ্ছ সংযোজনের উদ্যোগও এই সময়ের মধ্যে নেয়া হয়েছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হলো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন— ১৯৮৬-৮৭ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর এই সম্মান পাওয়া দ্বিতীয় বাংলাদেশি তিনি। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাস্তবসম্মত অগ্রগতি লক্ষ করা গেছে। এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নয়াদিল্লি সফরের পর ভারত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ৪০ হাজার টন ডিজেল রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেয় এবং চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সীমান্তে উত্তেজনা ও পুশ-ইনের অভিযোগ এখনো দুই দেশের সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করছে, যার প্রেক্ষাপটে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের এই উদ্যোগকে বিশ্লেষকরা ঢাকার সুচিন্তিত ও বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রয়াস হিসেবে দেখছেন।
অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা: গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সারা দেশে ৬৬৬টি খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনা তৈরি করতে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে সরাসরি উপকৃত করবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের কাজ চলছে পুরোদমে, লক্ষ রাখা হয়েছে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের। জাতীয় বিমান সংস্থার বহর সম্প্রসারণে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ সংযোজনের চুক্তিও সম্পন্ন হয়েছে। দেশের আকাশসীমা পর্যবেক্ষণে আধুনিক 'গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০' রাডার স্থাপন করা হয়েছে, যা ঢাকা থেকে ৬৫০ কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে ৮৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত নজরদারি করতে সক্ষম। ভূমিসেবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার কাজও এগিয়ে নেয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষকে ভূমি-সংক্রান্ত সেবার জন্য আর হয়রানির শিকার হতে না হয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে অগ্রগতি: স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল হামের প্রাদুর্ভাব, যাতে সারা দেশে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) আগেই টিকা সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছিল, যা তৎকালীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সময় যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব নেয়ার পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ, ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য বিভাগে প্রশাসনিক রদবদলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করে, এবং প্রায় শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়ানো হয়েছে, আর ধাপে ধাপে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা খাতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির সুবিধা সম্প্রসারিত করা হয়েছে, এবং ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু হয়েছে।শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে প্রতিবছরের পুনর্ভর্তি ফি বাতিল করা হয়েছে এবং ভর্তিতে লটারি পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে, পাশাপাশি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা জোরদার করতে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ই-হেলথ কার্ড চালু করা হয়েছে এবং প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটির সমন্বয়ে সাপ্তাহিক জাতীয় পরিচ্ছন্নতা অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম ও ক্রীড়া উন্নয়ন: তরুণদের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে 'নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস' কর্মসূচি চালু হয়েছে, যেখানে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যাথলেটরা অংশ নিচ্ছে। সারা দেশে ৫৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ক্লাবে ক্রীড়া সরঞ্জাম বিতরণ করা হয়েছে, যা তৃণমূল পর্যায়ে খেলাধুলার চর্চাকে উৎসাহিত করবে বলে আশা করা যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠ শিশু-কিশোরদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে এবং সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও কোরআন তেলাওয়াতকেন্দ্রিক নতুন কুঁড়ি কর্মসূচির পরিধি আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ৬টি খেলা বিষয়ে মোট ১৮ জন ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের কাজও শুরু হয়েছে, যা তৃণমূলে খেলাধুলার প্রসারে সহায়ক হবে।
সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা: সরকারের কর্মকাণ্ডে একটি লক্ষণীয় দিক হলো ব্যয়সংকোচনের প্রতীকী উদ্যোগ। বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা অতীতের রীতি থেকে একটি স্পষ্ট বিচ্যুতি এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনার একটি প্রতীকী বার্তা। ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে মোট ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। বিচার ব্যবস্থাতেও দ্রুততার নজির স্থাপিত হয়েছে— মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে আদালত অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, যা দ্রুত বিচারের এক বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী নিজেরাই ভুক্তভোগী পরিবারের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানিয়েছেন এবং দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিনের ভাষায়, ভুক্তভোগীরা আর প্রধানমন্ত্রীর কাছে যান না, বরং প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাদের দরজায় পৌঁছে যাচ্ছেন।সুশাসন ও দায়বদ্ধতা জোরদার করতে প্রশাসনিক পর্যায়েও একাধিক রীতি পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে শনিবারও অফিস করছেন এবং কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রটোকল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে প্রধানমন্ত্রীর চলাফেরাকে সাধারণ করা হয়েছে, যার ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও নজিরবিহীন পরিবর্তন এসেছে। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করে মাত্র একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী, চিফ হুইপ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। শুল্কমুক্ত গাড়ির পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা সরকারি প্লট গ্রহণ না করারও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় করা হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়।
নারী নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ: নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ নারী-পরিচালিত ‘পিংক বাস’ চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি সাইবার বুলিং প্রতিরোধেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনতে সরকারি অফিসে অর্ধেক ফ্যান ও এসি ব্যবহারের নির্দেশ এবং অপচয় রোধে রাষ্ট্রীয় ইফতার আয়োজন সীমিত করা হয়েছে। কক্সবাজারের সুগন্ধা সি বিচে প্রায় ২০ বছর পর অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং দেশজুড়ে একই ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, পাশাপাশি পিলখানা হত্যাকাণ্ডের স্বচ্ছ বিচারের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ ও অগ্রযাত্রার পথে বাধা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় রূপকল্প বাস্তবায়নের এই গতিশীল (Dynamic) যাত্রাপথটি সম্পূর্ণ মসৃণ ছিল না; বরং তা নানামুখী সুগভীর প্রতিকূলতা ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতি, বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো তীব্র অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েই এই সরকারকে তার সংস্কার যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। এর ওপর, ক্ষমতা গ্রহণের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে উদ্ভূত আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ব্যাহত হওয়ার এই প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয় ও বাজেটের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে, যা অর্থনৈতিক রূপান্তরের গতিকে মন্থর করার এক কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে।
একই সাথে, দেশের ভেতরে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের তৈরি করা কৃত্রিম বাজার সংকট ও নেতিবাচক অপপ্রচারকে মোকাবিলা করেই সরকারকে পথ চলতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অদম্য সদিচ্ছা এবং সুচিন্তিত 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির কাছে এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চক্রান্তসমূহ প্রতিনিয়ত পরাস্ত হচ্ছে। চীন ও মালয়েশিয়ার সাথে সফল কূটনৈতিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণের মতো দূরদর্শী পদক্ষেপসমূহ প্রমাণ করে যে, কোনো আন্তর্জাতিক সংকট বা অভ্যন্তরীণ নেতিবাচকতা বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করতে পারবে না।
উপসংহার: মাত্র কয়েকমাসে কোনো সরকারের সব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়ে যাওয়ার কথা নয়, আর তারেক রহমানের সরকারও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই সামাজিক সুরক্ষা, অর্থনীতি, কূটনীতি, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুশাসনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়— পরিবর্তনের অভিপ্রায় এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা আনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করা— এই তিনটি ক্ষেত্রে আগামী দিনগুলোতে সরকারের সদিচ্ছার প্রকৃত পরীক্ষা হবে। তবে নজরুলের কবিতার সেই থেমে না থাকার সুর, আর সুকান্তের স্বপ্নে দেখা ক্ষুধামুক্ত পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা— দুটোই যেন একটি জাতির প্রতিদিনের বাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে আছে। আর ম্যাক্সওয়েলের সেই ভাবনার প্রতিধ্বনি করেই বলা যায়, বাংলাদেশের জন্য যে পথ আজ কঠিন মনে হচ্ছে, দৃঢ় নেতৃত্ব ও জনগণের আস্থা একসঙ্গে থাকলে আগামী দিনে তা-ই হয়তো হয়ে উঠবে অর্জনের এক নতুন ইতিহাস।
মো. আমানউল্লাহ আমান
সাংগঠনিক সম্পাদক
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ।
