বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন এখন বেশি জনপ্রিয়

পিউ রিসার্চের গবেষণা

বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন এখন বেশি জনপ্রিয়

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বজুড়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের পক্ষে মানুষের সমর্থন বেশি দেখা যাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের নতুন এক গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যের বরাতে এ খবর প্রকাশ করেছে বিবিসি। দলনিরপেক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই থিংক ট্যাংকের গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত করছে, অনেক দেশে চীনের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ধারণা আরও খারাপ হয়েছে। তবে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের নেতা শি জিনপিং উভয়ের প্রতিই কম আস্থা প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চীন সরকারের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার নিজের দেশের মানুষের স্বাধীনতাকে বেশি মূল্যায়ন করে বলে এখনো বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করে।

তবে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন কম হস্তক্ষেপ করে বলে মনে করা হয়। পিউ গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের প্রশ্ন করা হয়, পরাশক্তি দেশগুলো সম্পর্কে তাদের মতামত অত্যন্ত ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক নাকি অত্যন্ত নেতিবাচক। গবেষণা কেন্দ্রটি দেখেছে যে, ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণকারী মানুষের সংখ্যা বেশি। ২০০২ সাল থেকে পরাশক্তিগুলোর প্রতি বৈশ্বিক মনোভাব পর্যবেক্ষণ শুরু করার পর এতগুলো দেশে চীনের প্রতি এমন ফলাফল এবারই প্রথম দেখা গেছে বলে পিউ রিসার্চ সেন্টারের অন্যতম গবেষক জোনাথন শুলম্যান জানিয়েছেন। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের প্রশাসনের শেষ সময়ে ২০০৮ সালে এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমে যেতে দেখা যায়। শুলম্যান বিবিসিকে বলেন, তবে তখনও চীনের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম থাকার প্রবণতা ছিল।

স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস ও কানাডা ছিল সেই দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে চীনের দিকে মানুষের ঝোঁক দেখা গেছে। এই বছরের জরিপে মাত্র ছয়টি দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বেশি সমর্থন ধরে রেখেছে, যার মধ্যে বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর মিত্র রাষ্ট্র, যেমন পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান এবং ইসরাইল। পৃথকভাবে গবেষণা কেন্দ্রটি দেখেছে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ২০টি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকা গড় ইতিবাচক মতামত ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে, যেখানে চীনের পক্ষে গড় ইতিবাচক মতামত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং তুরস্কসহ এই বছর জরিপ করা কিছু স্থানে চীনের পক্ষে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। পাকিস্তানের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ চীনের পক্ষে মত দিয়েছেন, যেখানে জাপানের মাত্র ১১ ভাগ মানুষ তা করেছেন। বিশ্ব বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে শি জিনপিং এবং ট্রাম্পের ওপর মানুষের কতটা আস্থা রয়েছে, তা-ও জরিপে জানতে চাওয়া হয়েছিল। সামগ্রিকভাবে দুই নেতার ওপরই আস্থার স্তর সাধারণত কম ছিল এবং বেশিরভাগ স্কোর ছিল ৫০ ভাগের নিচে। তবে জরিপ করা অনেক দেশ ট্রাম্পের চেয়ে শি জিনপিংয়ের ওপর বেশি আস্থা দেখানোর প্রবণতা দেখিয়েছে।

জরিপে শি জিনপিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন রেটিং এসেছে যথাক্রমে পাকিস্তান ও জাপান থেকে, যা ৮৩ ভাগ এবং ৭ ভাগ। অন্যদিকে ট্রাম্পের জন্য সর্বোচ্চ রেটিং ফিলিপাইন থেকে ৬৮ ভাগ এবং সর্বনিম্ন রেটিং পশ্চিম তীর/পূর্ব জেরুজালেম থেকে মাত্র ৪ ভাগ। এছাড়া অন্য কয়েকটি মধ্যম আয়ের দেশে পরাশক্তিগুলোর পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অতিরিক্ত কিছু প্রশ্ন করা হয়। সেখানে গড়ে ৭৫ ভাগ মানুষ মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনেক বেশি বা বেশ ভালো পরিমাণে হস্তক্ষেপ করে, যেখানে চীনের ক্ষেত্রে মাত্র ৪৫ ভাগ মানুষ একই মত দিয়েছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই ধরনের গবেষণা পরিচালনা করেছে। জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ দেখেছে যে, গত বছর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার রেটিংয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে, যা গত ২০ বছরের মধ্যে চীনের পক্ষে রেকর্ড করা সবচেয়ে বড় ব্যবধান। তবে যুক্তরাষ্ট্রের থিংক ট্যাংক এশিয়া সোসাইটির বার্ষিক বৈশ্বিক জনমত জরিপ ইঙ্গিত করেছে যে, মহামারির সময়ে চীনের ভাবমূর্তি যেভাবে হ্রাস পেয়েছিল, তা পরবর্তীতে কেবল সামান্যই পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে।

কার্নেগি চায়নার নন-রেসিডেন্ট স্কলার চং জা ইয়ান বলেন, পিউ-এর সর্বশেষ ফলাফল আশ্চর্যজনক নয়। তিনি উল্লেখ করেন, বলপ্রয়োগ এবং এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতিসহ যুক্তরাষ্ট্রের নীতির অস্থিরতা অনেককে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গ্রিনল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য জোরদার করা এবং ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের বন্দি করার কিছুকাল পরেই পিউ-এর এই জরিপ শুরু হয়। জরিপ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথেও যুদ্ধে জড়ায়। অপরদিকে বেইজিং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কঠোর পরিশ্রম করছে।

চীনের জন্য উচ্চ ইতিবাচক স্কোর এবং শি জিনপিংয়ের প্রতি তুলনামূলক কম আস্থার মধ্যকার পার্থক্যের বিষয়ে ডক্টর চং বলেন, চীন হয়তো আরও অনুমানযোগ্য এবং এটি কাউকে কাউকে স্বস্তি দেয়। তবে এই সত্যকে এড়ানো যায় না যে শি জিনপিং একজন বড় কর্তৃত্ববাদী ব্যক্তিত্ব। চং মনে করেন, মানুষ সম্ভবত আরও জবরদস্তিমূলক এবং অর্থনৈতিকভাবে কম সহায়ক নীতিগুলোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে শি জিনপিংকে দায়ী করে। তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মতো আরও ইতিবাচক উপাদানগুলো সামগ্রিকভাবে চীনকে এগিয়ে রেখেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন