মেসিই সেরা। মেসি অপ্রতিরোধ্য। এক গোলে পিছিয়ে থেকে আর্জেন্টিনা যেভাবে খেলায় ফিরেছে তার মূল কারিগর মেসি। তার নিখুঁত পাস থেকেই গোল করেছেন এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ। দুর্দান্ত খেলেছেন মেসি। আর ভুলের মাশুল দিয়েছে ইংলিশরা। আর্জেন্টিনা এখন স্পেনের মুখোমুখি হবে ফাইনালে। এ যেন আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ফিরে আসার গল্প। মেসির জন্য ইংলিশ পরীক্ষা ছিল কঠিন। কিন্তু বিশ্বকাপের এই সেমিফাইনালে ইংলিশদের গুঁড়িয়ে দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন- মেসির বিকল্প মেসিই। প্রথম গোল করেও খেলা শেষের আগে পরপর দুটো গোল ইংলিশদের হজম করতে হয়। যা ছিল অনেকটা অবিশ্বাস্য। এর পেছনে ইংলিশ কোচ থমাস টুখেলের কৌশল ছিল ভুল। ডিফেন্সে ছয়জন রেখে ভুলের খেসারত তাকে দিতেই হলো। মিশর যে ভুল করেছিল, ইংল্যান্ডও তাই করলো। আর্জেন্টিনার সঙ্গে ২ গোলে এগিয়ে থেকেও তারা হেরেছিল ডিফেন্সিভ কৌশলের কারণে। কিন্তু আর্জেন্টিনার মতো টিমকে আটকানো কি এত সহজ! যেখানে মেসি রয়েছেন! মাঠ জুড়েই ছিলেন মেসি। ৫৫ মিনিটে ইংলিশ ফরওয়ার্ড অ্যান্থনি গর্ডন গোল করেন। এরপর থেকে তারা পুরোটাই ডিফেন্সিভ এবং অগোছালো হয়ে যায় । আর এর সুযোগ নেন লিওনেল মেসি। মেসি তো এমনই। এটা মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাকে জিততেই হতো। একার লড়াই আর নিজের জাদুতে মেসি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে গেলেন। গোলের পর মেসি ফুঁসে ওঠেন। তিনি খেলায় একের পর আক্রমণ শানাতে থাকলেন। আর্জেন্টাইন হানায় একদম ভেঙে পড়ে ইংলিশ রক্ষণভাগ। অবশ্য ইংলিশ গোলকিপার পিকফোর্ড নিশ্চিত তিনটি গোল রুখে দেন। ৫৮ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোল পেয়েই যাচ্ছিল। ইংলিশ ডিফেন্ডার জেড স্পেনস আর্জেন্টিনার একটা অবধারিত অ্যাটাক বানচাল করে দেন। স্পেনস অসাধারণ খেলেছেন। জেড স্পেনস ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম প্লেয়ার। নরওয়েকে হারানোর পর জেড স্পেনস হাঁটু গেড়ে বসেন এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশ্বকাপে স্পেনসের উত্থান চোখে পড়ার মতো। যাইহোক, খেলার শুরুটা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। একের পর এক ফাউল করে আর্জেন্টিনা খেলছিল। প্রথমার্ধেই ১২টি ফাউল করে। ইংল্যান্ড করেছিল ৭টি। এই খেলায় চারটি হলুদ কার্ড হয়েছে। তিনটিই আর্জেন্টিনার। শেষ কথা, ইংলিশদের ভাগ্য বদলায়নি। এবার সুযোগটা এসেছিল। বলা চলে, নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারলো। বদলালো না ইতিহাস। যে ইতিহাস বদলানোর জন্য ৬০ বছর ধরে তারা লড়াই করছে।
শ্বাসরুদ্ধকর এই খেলা শেষে গ্যালারি জুড়ে উচ্ছ্বাস। ওলে ওলে শব্দে মাঠ যেন কাঁপছিল। মেসির অন্তহীন আনন্দ। তিনি রীতিমতো কাঁপছিলেন। ফুটবলে ভাগ্য বলেও একটা কথা আছে। মেসি আসলেই ভাগ্যবান। ৩৯ বছর বয়সে তিনি যেভাবে এবার বিশ্বকাপ মাতালেন ইতিহাসে তা নজিরবিহীন। ফাইনালে কী করেন দেখা যাক। নতুন কোনো ইতিহাস তৈরি হয় কিনা!
খেলা শেষে হ্যারি কেইন যা বললেন
বিবিসি ওয়ানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন বলেন, ছেলেদের জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, দলের জন্য, কোচিং স্টাফের জন্য, সমর্থকদের জন্য। সবার জন্যই খুব খারাপ লাগছে।
ম্যাচের বেশিরভাগ সময় আমরা ভালো খেলেছি। ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর মনে হলো- আমরা শুধু সেই লিড ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই পর্যায়ের ফুটবলে সেটা যথেষ্ট নয়। তাই খুব হতাশ লাগছে। কারণ এখানে পৌঁছাতে আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং ছেলেরা নিজেদের শেষ শক্তিটুকু উজাড় করে দিয়েছে- দৌড়, রক্ত, ঘাম, চোখের জল সবকিছু। তাই এত কাছে এসেও লক্ষ্য পূরণ করতে না পারাটা সত্যিই হৃদয়বিদারক। ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর কী সমস্যা হয়েছে, সে সম্পর্কে কেইন বলেন, আমরা বলের ওপর চাপ তৈরি করতে হিমশিম খেয়েছি। বিশেষ করে প্রথমার্ধে এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে। যদিও আমরা তাদের ভালোভাবে প্রেস করেছিলাম এবং মাঠের উঁচু এলাকায় অনেক চাপ সৃষ্টি করেছিলাম। এর ফলে আমরা বল পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি। কিছুটা ভালোভাবে খেলার নিয়ন্ত্রণও নিতে পেরেছি।
গোলের পর কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে তার মন্তব্য, গোল করার পর হয়তো তারা আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়ে আক্রমণে উঠেছিল। অথবা আমরা ব্যক্তি-ব্যক্তি লড়াইয়ে তাদের সঙ্গে তাল মেলাতে পারিনি। ফলে একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আমাদের ওপর এসে আছড়ে পড়ছিল। ছেলেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে শট ব্লক করছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি যথেষ্ট ছিল না।
এটি কি দলের জন্য এক ম্যাচ বেশি হয়ে গেল কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জানি না। ছেলেরা সবসময় ম্যাচের যেকোনো মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত থাকে। আমরা এগিয়ে যাওয়ার পর বার্তা ছিল আবার আক্রমণে যাওয়া এবং আরেকটি গোল করার চেষ্টা করা। কিন্তু তারা যখন তাদের দুটি গোল করে ফেলল, তখন আমরা ম্যাচে ফেরার জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করেছি। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা আর খেলার গতি ও নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পক্ষে ফিরিয়ে আনতে পারিনি।
