কিছু কিছু ম্যাচকে শুধু মাঠের লড়াই দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ ঠিক তেমনই। স্টেডিয়ামের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর মর্যাদার ইতিহাস জড়িয়ে আছে তাতে। ১৯৬৬’র কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে শুরু। ফকল্যান্ড যুদ্ধের জেরে ৮৬’র আসরে সেই আগুনে ঘি ঢালেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতারা ১৯৯৮-এ ইংলিশদের আরেকবার বিদায় করে জারি রাখেন উত্তেজনা। চার বছর পর গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলেপ দিয়েছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু আজতেকায় ম্যারাডোনার কাছে হারের ওই প্রতিশোধ ঠিক নেয়া হয়নি। তাইতো আজকের সেমিফাইনাল সামনে রেখে সাবেক ইংলিশ তারকা জো কোলের হুঙ্কার, ‘মেসিদের আমরা ঘুম পাড়িয়ে রাখবো।’ কোলের মতো অনেকেই ইংল্যান্ডকে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে দিয়েছেন। কথার যুদ্ধে অনেকটাই এগিয়ে ইংলিশ শিবির। কিন্তু ইতিহাস বলছে আর্জেন্টিনা কখনো সেমিতে হারে না। আর মাঠের লড়াইয়ে কে জিতবে সেটার ফায়সালা হবে আটলান্টায়।
মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মহাকাব্যিক লড়াই শুরু রাত ১টায়। আর্জেন্টিনার কাছেও ম্যাচটির গুরুত্ব কতটুকু সেটি বুঝা গেছে ‘নীল জার্সি’ চাওয়ার মধ্য দিয়েই। ৮৬’র ওই আইকনিক নীল জার্সিতে ইংলিশদের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে মরিয়া লিওলেন মেসি অ্যান্ড কোং। গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজ বলেছেন, ‘ইতিহাস, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দিয়েগো এবং তার হ্যান্ড অব গড গোলের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলাটা নিঃসন্দেহে বিশেষ।’ আর লিওনেল মেসির জন্যও এটি বিশেষ এক ম্যাচ। এর আগে ইংলিশ ক্লাবের বিপক্ষে অনেকবার খেললেও ক্যারিয়ারে প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি। কেইন- বেলিংহ্যামদের বিপক্ষে খেলতে রোমাঞ্চিত মেসি। তিনি বলেন, ‘বড় দলের বিপক্ষে খেলাটা সবসময়ই স্পেশাল। আর বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল হলে তো কথাই নেই। আমি ইংল্যান্ডের সঙ্গে কখনো খেলিনি। কাজেই ম্যাচটা আলাদা হবে।’ ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা মেসিই। ইতোমধ্যে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল দুই ক্যাটাগরিতেই বিবেচনায় রয়েছেন তিনি। কিন্তু আজ হেরে গেলে হয়তো ক্যারিয়ারেরই শেষ দেখে ফেলবেন এই মহাতারকা।
কানসান সিটি ছাড়ার আগে তার আবেগী বার্তা, ‘সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।’ ওদিকে মেসিকে নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই ইংলিশ শিবিরে। বিশ্বকাপে ২১ গোল করা মেসিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৈরি ও’রাইলি। ইংলিশ ডিফেন্ডার বলেন, ‘আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। এমন সুযোগ জীবনে জীবনে একবারই আসে। তিনি ক্যারিয়ারের শেষপ্রান্তে। আমার মতে, ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় তিনি। এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার জন্য আমি মুখিয়ে আছি।’ ইংলিশ গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডও মেসিকে সম্মান জানাচ্ছেন। কিন্তু তার চিন্তায় পুরো আর্জেন্টিনা দলই। পিকফোর্ড বলেন, ‘আমরা সবাই জানি তিনি (মেসি কতটা ভালো। কিন্তু আমরা এটাও জানি আর্জেন্টিনা দলটাও কতটা চমৎকার। শুধু মেসিকে থামানোর ভাবনা বাদ দিতে হবে। তাদের অন্য শক্তি ও দুর্বলতার জায়গাগুলোতেও মনযোগ দেয়া দরকার।’
ঠাণ্ডা মাথার কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য সকল আবেগ সরিয়ে রাখছেন। তার কাছে এটা, ‘কেবলই একটা ম্যাচ।’ স্কালোনির ভাবনাজুড়ে এখন কেবল ট্যাকটিকস। সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস জানিয়েছে, কানসান সিটিতে শেষ অনুশীলন সেশনে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন তিনি। কয়েকটি জায়গায় পরিবর্তন আনতে পারেন এই কোচ। তবে স্কালোনি যেহেতু বরাবরই স্কোয়াড গোপন রাখতে ভালোবাসেন, কাজেই কারা খেলবেন সেটা অজানাই থেকে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, নাহুয়েল মলিনার জায়গায় গঞ্জালো মন্তিয়েল এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন নিকোলাস গঞ্জালেস। অন্যদিকে, ১৯৬৬’র পর প্রথমবার ফাইনাল খেলার স্বপ্নে বিভোর ইংল্যান্ড শিবির ধুঁকছে চোট সমস্যায়।
কোয়ার্টার ফাইনালে পুরো ৯০ মিনিট খেলতে পারেননি মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ডেক্লান রাইস। সহকারী কোচ অ্যান্থনি ব্যারি জানান, রাইসের পুরো ম্যাচ খেলার মতো ফিটনেস নেই। যদিও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শুরুর একাদশে তার থাকার সম্ভাবনা প্রবল। দলের একমাত্র ফিট রাইটব্যাক রিস জেমসের পজিশন নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। শুরুতেই রিস ফুলব্যাক হিসেবে খেলবেন নাকি এরজি কনসাই সে দায়িত্ব সামলাবেন সেটি অজানা। বুকায়ো সাকা গত ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে দারুণ প্রভাব রেখেছিলেন। ননি মাদুয়েকের জায়গা নিতে পারেন তিনি। এতে উইংয়ের ধার আরও বাড়বে ইংল্যান্ডের।
