ওসলোর রাস্তায় রাজকীয় সংবর্ধনা

বীরের বেশে ফিরলেন হালান্দরা

ওসলোর রাস্তায় রাজকীয় সংবর্ধনা

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে ভেঙে যায় কোটি নরওয়েজিয়ানের হৃদয়। মাঠের সেই কান্না ও ট্র্যাজেডি সোমবার ওসলোর রাস্তায় রূপ নিলো এক অভূতপূর্ব জাতীয় উৎসবে। মহাগুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনালের টিকিট হাতছাড়া হলেও, দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়া বীরদের বরণ করতে কোনো কমতি রাখেনি নরওয়ে। রাজধানী ওসলোর রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নামে নিজেদের ফুটবল দলকে একনজর দেখার জন্য।

উত্তর ইউরোপের কড়া রোদ মাথায় নিয়ে সোমবার ওসলোর রাজপ্রাসাদের চত্বর ও এর চারপাশের রাস্তা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ডেসার্ট আইল্যান্ড থেকে বিশেষ বিমানে করে নরওয়ে স্কোয়াড ওসলো বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়াটার ক্যানন স্যালুট’ দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। বিমানবন্দর থেকে দলটি সরাসরি চলে যায় রাজপ্রাসাদে, যেখানে রাজা হারালদ তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা দেন। প্রাসাদ চত্বর ছাড়িয়ে ভক্তদের দীর্ঘ লাইন ওসলোর প্রধান সড়ক ‘কার্ল জোহানস গেট’ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যায়।

প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন পুরো দল ভক্তদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ছিল, তখন তাদের পেছনে ‘গার্ড অব অনার’ নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়্যাল গার্ড। কোয়ার্টারের সেই হৃদয়ভাঙা হারের পর ড্রেসিংরুমে গিয়েই খেলোয়াড়দের এই রাজকীয় আমন্ত্রণের কথা জানান ক্রাউন প্রিন্স হ্যাকন।

স্যুটের ওপর জাতীয় দলের স্কার্ফ জড়িয়ে সেদিন তিনি ভেঙে পড়া খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আপনারা যখন দেশে ফিরবেন, রাজা আপনাদের রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানাতে চান। আপনারা এই মুহূর্তে হতাশ হতেই পারেন, তবে দেশের বাকি সবাই আপনাদের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এবং আমরা আপনাদের নিয়ে সত্যিই গর্বিত। আপনারা আমাদের জন্য যা করেছেন, তা সত্যিই অমূল্য।’

হালান্দের অনুপস্থিতি ও ‘ভাইকিং রো’ উন্মাদনা
উৎসবের শেষভাগে মূল রাজকীয় মঞ্চে আর্লিং ব্রুট হালান্দের অনুপস্থিতি বেশ চোখে লেগেছে। প্রাসাদ চত্বরে ভক্তদের সঙ্গে উদ্‌যাপনের শুরুতেই তিনি ও মিডফিল্ডার স্যান্ডার বার্গ বিমান ধরার তাগাদায় দল ছেড়ে চলে যান। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের ফ্লাইট চার ঘণ্টা বিলম্বিত হওয়ায় এই তাড়াহুড়ো করতে হয় তাদের। দলের প্রধান কোচ স্তালে সোলবাকেন বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমাদের যাত্রা চার ঘণ্টা বিলম্বিত হওয়ায় আর্লিং এবং স্যান্ডারকে তড়িঘড়ি করে নিজেদের পরবর্তী ফ্লাইট ধরতে হয়েছে।’ এ কারণে ওসলোর সিটি হল স্কয়ারের সামনে লাখো ভক্তের সঙ্গে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে জনপ্রিয় থিম ‘ভাইকিং রো’ (নৌকা বাওয়ার ভঙ্গিতে ভক্তদের গর্জন) উৎসবে অংশ নেয়া হয়নি তাদের। রাজপ্রাসাদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে যুবরাজ হ্যাকন নিজে ড্রাম বাজিয়ে হাজার হাজার ভক্তকে সঙ্গে নিয়ে এই ভাইকিং উল্লাসের নেতৃত্ব দেন। নরওয়ের এই প্রাচীন ঐতিহ্যের আদলে গড়া উদ্‌যাপনে ভক্তরা মাটিতে বসে সারি বেঁধে ‘রো! রো! রো!’ বলে চিৎকার করে, যা এই বিশ্বকাপে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এমনকি এই টুর্নামেন্ট চলাকালীন হালান্দের ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার ৪০.৭ মিলিয়ন থেকে লাফিয়ে ৬৫.৯ মিলিয়নে পৌঁছেছে। আমেরিকার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হালান্দও বিদায়ের আগে বলেছিলেন, ‘আমি আমেরিকানদের পছন্দ করি। ওরা বেশ মজার মানুষ। এই বিশ্বকাপে স্টেডিয়াম, অনুশীলন মাঠ থেকে শুরু করে সব আয়োজনই ছিল এককথায় অসাধারণ।’

তারের বাধা এবং কোচের হাস্যরস
প্রাসাদের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওসলোর রাস্তায় ছাদখোলা বাসে করে শুরু হয় ট্রফিহীন চ্যাম্পিয়নদের বর্ণাঢ্য প্যারেড। ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে সেন্ট্রাল ওসলোর রাস্তায় একপর্যায়ে বাসের গতি সম্পূর্ণ থমকে যায়। এমনকি পুলিশও ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিল। তবে বাসের উপর দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়রা বিয়ারের ক্যান হাতে গান গেয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন।
তবে এই ছাদখোলা বাস প্যারেডের মাঝে ঘটে এক অদ্ভুত ও হাস্যকর ঘটনা। ওসলোর রাস্তার উপর নিচু হয়ে ঝুলে থাকা কিছু তারের কারণে হুট করেই বাসটি থামিয়ে দিতে হয়। বাসের উপর দাঁড়িয়ে পতাকা নাড়তে থাকা খেলোয়াড়দের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে বাসের মেঝেতে বসে পড়তে হয়। তারগুলো পার হওয়ার পর দোতলা বাসটি আবার সামনে এগোয়। ঘটনাটি নিয়ে কোচ সোলবাকেন কিছুটা রসিকতা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কারণ, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টারে প্রথমার্ধে জুড বেলিংহাম যখন সমতাসূচক গোলটি করেন, তার ঠিক আগে বলটি মাঠের ওপরে ঝুলে থাকা ক্যামেরার তারে লাগে বলে দাবি করেছিলেন সোলবাকেন। যদিও ফিফা বারবার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারের কারণে বাস থামার পর সোলবাকেন যেন মাঠের সেই ‘ক্যাবল’ বিতর্কেরই পুনরাবৃত্তি দেখলেন ওসলোর রাস্তায়।

প্রত্যাশার অতীত ভালোবাসা
দীর্ঘ ১.৩ কিলোমিটারের এই প্যারেড শেষ হয় ওসলোর সিটি হল স্কয়ারে। সেখানে আগে থেকেই হাজার হাজার ভক্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। ঘরের মাঠে এমন ভালোবাসা দেখে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। নরওয়েজিয়ান সম্প্রচার মাধ্যম এনআরকে-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না কেউ কখনো এমন কিছু কল্পনাও করতে পেরেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এবং আমাদের নিজেদের দেশে আমরা যে সমর্থন পেয়েছি, তা আমাদের সমস্ত প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই দৃশ্য দেখাটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন