আইসিডিডিআর,বি’র গবেষণা

বাংলাদেশে প্রতি ১৩ জনে ১ জন নারীর অকালে মেনোপজ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে প্রতি ১৩ জন নারীর মধ্যে একজনের ৪৫ বছর বয়সের আগেই মেনোপজ বা স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা স্বাভাবিক নয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব দেশে গড়ে প্রতি ১৪ জনে একজন নারীর অকালে মেনোপজ হচ্ছে। গবেষণাটির ফলাফল সম্প্রতি বিএমজে গ্লোবাল হেলথ-এ প্রকাশিত হয়েছে। আজ গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি এ তথ্য জানিয়েছে।

মেনোপজ একজন নারীর জীবনের স্বাভাবিক একটি পর্যায়, যা সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে। তবে ৪৫ বছরের আগে স্থায়ীভাবে মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে তাকে আর্লি মেনোপজ এবং ৪০ বছরের আগে হলে প্রিম্যাচিউর মেনোপজ বলা হয়। সময়ের আগে মেনোপজ হলে নারীরা প্রত্যাশার আগেই ইস্ট্রোজেন হরমোনের সুরক্ষামূলক প্রভাব হারান। ফলে হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস (হাড় ক্ষয়জনিত রোগ), স্মৃতিভ্রংশ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে এবং জীবনমানও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গবেষণায় ৪৪টি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের ৩০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৪৮ জন নারীর জাতীয় ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (ডিএইচএস)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের মাসিক ও প্রজনন-সংক্রান্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করে যাদের অন্তত ছয় মাস ধরে মাসিক হয়নি অথবা যারা মেনোপজ কিংবা জরায়ু অপসারণের কথা জানিয়েছেন, তাদের মেনোপজ হয়েছে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপর ৪৫ বছরের আগেই যাদের মেনোপজ হয়েছে, তাদের শনাক্ত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১২ মাসের সংজ্ঞা ব্যবহার করে পুনরায় বিশ্লেষণ করলেও একই ধরনের ফল পাওয়া যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সময়ের আগে মেনোপজের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর গড় ৭ দশমিক ১ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় নেপালে এ হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ভারতে ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব ফলাফল ইঙ্গিত করে এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

গবেষণায় সময়ের আগে মেনোপজের ক্ষেত্রে স্পষ্ট সামাজিক বৈষম্যের চিত্রও উঠে এসেছে। শহরের নারীদের তুলনায় গ্রামের নারীদের ৪৫ বছরের আগেই মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। শিক্ষা, আর্থিক অবস্থা, কর্মসংস্থান ও প্রজনন-সংক্রান্ত ইতিহাস বিবেচনায় নেয়ার পরও গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আর্লি বা প্রিম্যাচিউর মেনোপজের ঝুঁকি ১৭ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এটি স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও জীবনযাত্রার মানের দীর্ঘদিনের বৈষম্যের প্রতিফলন।
শিক্ষা সময়ের আগে মেনোপজের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা নারীদের তুলনায় প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ঝুঁকি ১১ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষা পাওয়া নারীদের ২৮ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষিত নারীদের ৫৮ শতাংশ কম।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব নারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সে বিয়ে করেছেন এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাদের ৪৫ বছরের আগে মেনোপজ হওয়ার আশঙ্কা ১৮ বছরের আগে বিয়ে ও সন্তান জন্ম দেয়া নারীদের তুলনায় কম।
দেশভেদে সময়ের আগে মেনোপজের হারেও বড় পার্থক্য পাওয়া গেছে। ইথিওপিয়ায় এ হার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ। এরপর রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১১ দশমিক ৫ শতাংশ) ও মিয়ানমার (১০ দশমিক ৩ শতাংশ)। গ্যাবনে হার ২ দশমিক ৬ শতাংশ, আর্মেনিয়ায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন জর্ডানে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। । দেশগুলোর মধ্যে এই বড় পার্থক্য ইঙ্গিত করে স্থানীয় সামাজিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার পার্থক্য এসব ভিন্নতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও আইসিডিডিআর,বি-র গবেষক রাইসা বিনতে ইসলাম বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে অকাল বা আর্লি মেনোপজ কেবল জৈবিক কারণেই ঘটে না। ৪৪টি দেশে দেখা গেছে, কম শিক্ষিত নারীরা, গ্রামীণ সমাজে বসবাসকারী নারীরা এবং যারা অল্প বয়সে বিয়ে বা সন্তান জন্মদান করেছেন, তারা ধারাবাহিকভাবে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। মেয়েদের শিক্ষার উন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবায় সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রজনন স্বাস্থ্যের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদী সুফল বয়ে আনতে পারে।

আইসিডিডিআর,বি-র ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ ডিভিশনের সিনিয়র ডিরেক্টর ডা. আনিসুর রহমান বলেন, অকাল বা আর্লি মেনোপজকে শুধু প্রজনন জীবনের একটি ধাপ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একজন নারীর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অকাল মেনোপজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার অংশ হিসেবে নারীর মেনোপজের বয়স সম্পর্কে তথ্য নেয়া প্রয়োজন। যেসব নারীর অকাল মেনোপজ হয়, তাদের হৃদরোগ, অস্টিওপোরোসিস (হাড় ক্ষয়জনিত রোগ), বিষণ্নতা এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি বেশি থাকে। আমি চিকিৎসকদের অনুরোধ করব, তারা যেন নিয়মিতভাবে নারীদের মেনোপজের বয়স সম্পর্কে জানতে চান। এই সহজ তথ্যই ঝুঁকিতে থাকা নারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে, সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার পরিকল্পনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

যদিও অংশগ্রহণকারী সব দেশে ধূমপানের তুলনামূলক তথ্য পাওয়া যায়নি, তবু বিশ্বজুড়ে পরিচালিত গবেষণাগুলো ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছে যে, ধূমপান হলো একমাত্র প্রতিষ্ঠিত জীবনধারাগত কারণ যা অকালে মেনোপজের সাথে সম্পর্কিত। তাই নারী স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে ধূমপান ত্যাগে সহায়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে থাকা উচিত।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা, তাই কোনো বিষয়কে সময়ের আগে মেনোপজের সরাসরি কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা যায় না। গবেষণাটি অংশগ্রহণকারীদের দেয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেছে। পাশাপাশি ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, পরিবেশগত প্রভাব ও হরমোনভিত্তিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ডিএইচএস জরিপে ধারাবাহিকভাবে না থাকায় বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।

গবেষকেরা মেয়েদের শিক্ষায় আরও বিনিয়োগ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, মানসম্মত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং সময়ের আগে মেনোপজের জৈবিক ও সামাজিক কারণগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার আহ্বান জানিয়েছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন