পাকিস্তান শাসিত কাশ্মীরের (পিওকে) রাওয়ালাকোটে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাক বাহিনীর অভিযানের পর অঞ্চলটিতে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের নিউ বাস টার্মিনালের কাছে সংঘর্ষের সময় পাক বাহিনীর গুলিতে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে বেলুচ সাদুনাতি জেলার জাহিদ মুঘল, জাফর মুঘল, আরসালান আকবর এবং ওয়াজিদ হায়াতের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক এই সহিংসতায় অঞ্চলটিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছিল। নতুন করে এসব হতাহতের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়বে।
হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ
এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দারা ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করেছেন। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দাবি করেন, অঞ্চলটিতে মানবিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে।
বিক্ষোভে নারী, শিশু ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাসহ প্রায় ১০০ জন অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে কাশ্মীরের বেসামরিক এলাকা থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান। একই সঙ্গে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অভিযোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান।
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে চলা ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়টিও তুলে ধরেন তারা। তাদের দাবি, এই ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা ভারতকেও একটি ব্যতিক্রমী আহ্বান জানান। তারা মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়া এবং মানুষের জীবন রক্ষায় ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অব কন্ট্রোল) পুনচ ও ডোডা সেক্টরের মাধ্যমে খুলে দেয়ার দাবিও জানান তারা।
খাদ্য সংকট ও স্বাস্থ্যসেবায় ভয়াবহ চিত্র
সাম্প্রতিক সংঘর্ষের বাইরেও অঞ্চলটির বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। ২০২৫ সালে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, কাশ্মীরের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষ জীবিকার জন্য কৃষি ও গবাদিপশুর ওপর নির্ভরশীল হলেও ৫৭ শতাংশের বেশি পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
এছাড়া প্রায় ২৯ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছেন, যা পাকিস্তানের জাতীয় গড় ১৯ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার খাদ্য সংকটে রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের চিত্রও উদ্বেগজনক।
পাকিস্তানের ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ রিপোর্ট অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৯ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির (স্টান্টিং) সমস্যায় ভুগছে। এছাড়া প্রতি এক লাখ জীবিত শিশুজন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ১০৪ জন।
পাকিস্তানের তীব্র সমালোচনায় ভারত
মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সমালোচনা করেছে। ভারতের দাবি, দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত শোষণের ফলেই এই বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভ পাকিস্তানের কয়েক দশকের পদ্ধতিগত শোষণ, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং অবৈধভাবে দখল করা অঞ্চলে প্রশাসনিক নিপীড়নের সরাসরি ফল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় জনগণের যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান সরকার চরম পুলিশি নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। নারী ও শিশুসহ সাধারণ মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ, খাদ্য ও ওষুধের মতো জরুরি সরবরাহ বন্ধ রাখা, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন তিনি। ভারতের দাবি, বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে এই দমন-পীড়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পাকিস্তানকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
