বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয় : বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম

বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয় : বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম

ফন্ট সাইজ:

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ণ থাকবে। একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়; তার আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, আইনের প্রতি এবং নিজের বিবেকের প্রতি।’

মঙ্গলবার আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে শেষ কর্মদিবসে আয়োজিত বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে এ সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিদায়ী বক্তব্যে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় সুপ্রিম কোর্টে বিচারকের দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর নিচ্ছেন। তবে এটিকে তিনি বিচারিক জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগ কেবল বিচারক বা আইনজীবীদের নয়; এটি সবার প্রতিষ্ঠান। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—সবাই যদি বিচার বিভাগকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান মনে করেন, তাহলে এর মর্যাদা, স্বাধীনতা ও জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল।
নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশে তিনি বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ সততা, এরপর চরিত্র এবং তারপর অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই নিয়মিত সংবিধান, আইন, দেশি-বিদেশি রায় ও বিচারতত্ত্ব অধ্যয়ন করতে হবে। প্রয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইনেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সামনে মামলার জট কমানো, বিচারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিচক্ষণ ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধি, মানুষের ভোগান্তি কমানো এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জেলা পর্যায়ের বিচারকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সব সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা জয় করে নির্ভয়ে ন্যায়ের পক্ষে থাকতে হবে। জনগণের আস্থা অটুট রাখাই বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

বিদায়ী অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ছিলেন একজন আদর্শ বিচারপতি। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে মামলা শুনতেন এবং সব সময় ন্যায়সঙ্গত বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম একটি সমৃদ্ধ পারিবারিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। সাবেক উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ. কে. এম. নূরুল ইসলাম এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি বেগম জাহানারা আরজুর সন্তান হিসেবে সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিবেশে বেড়ে ওঠা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বিচারবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। আইনজ্ঞ হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবন, বিচারক হিসেবে প্রজ্ঞা এবং কবি হিসেবে সংবেদনশীলতা—সব মিলিয়ে তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী।

তিনি আরও বলেন, বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বিচার বিভাগে নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুখী জীবন কামনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন