মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বিশ্বকাপ

মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বিশ্বকাপ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল বিনোদনের চেয়েও বেশি কিছু উপহার দিতে পারে। এটি মানসিক সুস্থতার জন্যও উপকারী হতে পারে। খেলা দেখা এবং একসাথে তা উদযাপন করা মানুষের মধ্যে একতার অনুভূতি তৈরি করে। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখার সময় অনেক ফুটবল অনুরাগীই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যখন তার সমর্থন করা দল একটি গোল দেয়, তখন কোনো চায়ের দোকানে বা বড় পর্দায় একত্রে খেলা দেখতে থাকা সমর্থকেরা একসাথে উল্লাস করে ওঠেন। এমনকি মুহূর্তের মধ্যে অপরিচিত থাকা সত্ত্বেও একে অপরকে জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন।

মেলবোর্নের সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটির ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট কেটি উড জানান, এই ভাগাভাগি করে নেয়া মুহূর্তগুলো আসলে মানসিক স্বাস্থ্যকে উন্নত করতে পারে। উড বলেন, আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষামূলক উপাদান হলো সংযোগ। এই সংযোগ হতে পারে নিজের সাথে, অন্য মানুষের সাথে, আমাদের সম্প্রদায়ের সাথে কিংবা সংস্কৃতির সাথে। আর খেলাধুলা ঠিক এই জায়গাটিতেই কাজ করে। এটি মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে। এই ধরনের সংযোগ কেবল পরিবার বা বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি তৈরি হতে পারে যখন কেউ নিজেকে সাময়িকভাবে বড় কোনো কিছুর অংশ মনে করেন। আর মানুষকে এই ধরনের অনুভূতি দেয়ার জন্য বিশ্বকাপ একটি নিখুঁত মঞ্চ।

চলমান বিশ্বকাপে এমন চিত্রই দেখা যাচ্ছে। যেখানে বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা একসাথে উল্লাস করছেন, জার্সি বিনিময় করছেন বা হঠাৎ করেই একই দলের সমর্থনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। লরেন্স, কানসাসে আলজেরিয়া এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যকার ম্যাচ চলাকালীন শহরের কেন্দ্রস্থলটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি জনাকীর্ণ সবুজ-সাদা উৎসবের জায়গায় পরিণত হয়েছিল। আলজেরিয়া জাতীয় দল সেখানে তাদের বিশ্বকাপ ঘাঁটি করায় শত শত স্থানীয় আমেরিকান আলজেরিয়ার জার্সি পরে, মুখে জাতীয় রঙ মেখে এবং হাতে পতাকা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডয়চে ভেলে। ফুটবল কত দ্রুত সেতু তৈরি করতে পারে তা অন্য জায়গাতেও স্পষ্ট হচ্ছে। ভ্যাঙ্কুভারে সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়ার মধ্যকার শেষ ষোলোর ম্যাচের পর দুজনকে একসাথে কাটানো সন্ধ্যার স্মৃতি হিসেবে জার্সি বদল করতে দেখা গেছে। সিয়াটলে আমেরিকার বিদায়ের পর এক বেলজিয়ান সমর্থককে হতাশ মার্কিন ভক্তকে সান্ত্বনা দিতে দেখা যায়। সান ফ্রান্সিসকোর এক দর্শনার্থী জানান, এক ব্যক্তি তাঁর জার্সি দেখে সম্পূর্ণ অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, এটাই তো বিশ্বকাপ। কেটি উড এটিকে বিশ্বকাপের মতো একটি টুর্নামেন্টের অনন্য শক্তি হিসেবে দেখেন। দৈনন্দিন জীবনে যাদের কখনো দেখা হওয়ার কথা নয়, তারা একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একই অনুভূতি ভাগ করে নেন।

তিনি বলেন, আপনি জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে আসতে পারেন। কিন্তু যে মুহূর্তে আপনারা একই দলকে সমর্থন করবেন, তখন একটি অভিন্ন লক্ষ্য সহ যৌথ অভিজ্ঞতার জন্ম হবে। এই লক্ষ্যটি মানুষের অন্তর্ভুক্তির একটি মৌলিক চাহিদাকে পূরণ করে, যা অনেকে অবমূল্যায়ন করেন। কেউ কয়েক দশক ধরে ভক্ত নাকি প্রথমবারের মতো ম্যাচ দেখছেন, তা এখানে কোনো বিষয় নয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যৌথ অভিজ্ঞতা, ম্যাচের আগের উত্তেজনা, গোলের পরের গর্জন কিংবা পরাজয়ের পর ভাগ করে নেয়া হতাশা। একজন দর্শনার্থী বলেন, মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিদিন কীসের মধ্য দিয়ে যাই তা কেউ জানে না। এই কারণেই এই মুহূর্তগুলো এত বিশেষ। এমনকি কোনো নির্দিষ্ট প্রিয় দল না থাকলেও অনেকে এই পরিবেশ উপভোগ করেন। ফিলাডেলফিয়ার এক দর্শনার্থী বলেন, আমি কেবলই খুশি। আমার কোনো দল নেই, কিন্তু আমি এই খেলাগুলো দেখতে পছন্দ করছি।

বিশ্বকাপ দৈনন্দিন জীবনের নানা মানসিক চাপ থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকার পথ তৈরি করে দিতে পারে। উড ব্যাখ্যা করেন, যখন পৃথিবীতে এত কিছু ঘটছে, তখন আমরা আমাদের দৈনন্দিন রুটিন থেকে কিছুটা পালানোর উপায় খুঁজি। আর অন্য মানুষের সাথে মিলে বিশ্বকাপের সমস্ত উত্তেজনা ও আনন্দ উপভোগ করাটা এর একটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর উপায়। টুর্নামেন্টের মূল ফোকাস ফুটবল হলেও, অনেক ভক্তের কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকে ম্যাচের বাইরে ঘটে যাওয়া এই মানবিক মুহূর্তগুলোই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন