বন্যা ও ভারী বৃষ্টি: দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল, মাঠে কার্যকর প্রস্তুতি ছিল না

সহযোগীদের খবর

বন্যা ও ভারী বৃষ্টি: দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল, মাঠে কার্যকর প্রস্তুতি ছিল না

ফন্ট সাইজ:

সমকাল

দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘বন্যা ও ভারী বৃষ্টি: দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল, মাঠে কার্যকর প্রস্তুতি ছিল না’। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধস হতে পারে– এমন সতর্কবার্তা গত ১ জুলাই থেকেই দেওয়া হচ্ছিল আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তা। এমনকি এল নিনোর প্রভাবে বড় বন্যার শঙ্কার কথাও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জানা। তবে সেই পূর্বাভাস সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।

আগাম ত্রাণসামগ্রী মজুত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, চিকিৎসা দল সক্রিয় করা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতি; কোনোটিই প্রয়োজনীয় মাত্রায় নেওয়া হয়েছে– এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে টানা অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পাহাড়ধস কয়েক দিনের মধ্যেই মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের বন্যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি, সমন্বয়ের দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যর্থতা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্বের কারণেই ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন আকস্মিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে। তাই শুধু পূর্বাভাস নয়; সেই পূর্বাভাস কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যে ভাষায় পূর্বাভাস দেয়; সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। সতর্কবার্তাকে আরও সহজ করতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯ উপজেলা, ৩৩৪ ইউনিয়ন ও ১২ পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১-তে। বন্যা, পাহাড়ধস ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪ জন; আহত ৩৯ জন।

সরকারি বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১ জুলাই এক মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেই অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর ধারাবাহিকভাবে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। কক্সবাজার ও পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড় ধসের ঝুঁকির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়।

একই সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নদনদীর পানি দ্রুত বাড়া এবং কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রমের শঙ্কার তথ্য প্রকাশ করে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতির দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কতটা বৃষ্টি হবে বা কী পরিমাণ ঢল নামবে, তা শতভাগ নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তবে বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে– এমন তথ্য সরকারের কাছে ছিল। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় প্রশাসন চাইলে কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারত।

ক্ষতিগ্রস্ত জেলার বাসিন্দা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও মানুষকে সেখানে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। কোথাও কোথাও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতই হয়নি। সরকারি নির্দেশে মেডিকেল টিম গঠন হলেও অনেক জেলায় তা সময়মতো মাঠে নামেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধের সংকটে ভুগছেন দুর্গত মানুষ। দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমও বিলম্বিত হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণেও আগাম প্রস্তুতির ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বন্যা পরিস্থিতির শুরু হয় ৫ জুলাই। ওই দিনই পাহাড়ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়। তবে সাত জেলার জন্য প্রথম দফায় ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১২ জুলাই। প্রথম ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ টন চাল। পরে দেশের অন্য ৫৭ জেলার জন্য অতিরিক্ত ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও ৫ হাজার ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগেই একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিপুলসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পুনর্বাসনে প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ সীমিত। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনী, বিজিবির পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় জনবল সংকটের কারণে বন্যা মোকাবিলা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

তবে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার বলেন, বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর জনবলসহ সামগ্রিক কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি’


ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে বিতরণের জন্য ৬৪ জেলার প্রশাসকদের ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল এবং ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যাকবলিত সাত জেলার প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ টন চাল।

এমন দুর্যোগ জীবনে দেখেননি বলে জানালেন বাশখাঁলীর প্রেমাশিয়া এলাকার নুরুল আমিন। তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলেমেয়েরা ৭ দিন ধরে কষ্ট করছে। পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থাও হয়নি।’

একই উপজেলার কাথারিয়া ইউনিয়নের বানুর বাপের বাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাদুর রশীদ (৫৫) কথার মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, ‘পরের জমি বর্গা চাষ করে কোনোমতে সংসার চলত। বানের পানিতে মাটির ঘরটাও ধসে গেল। এখন নতুন করে ঘর তুলব কীভাবে, সেই চিন্তাই মাথা থেকে নামছে না।’

পশ্চিম কোকদণ্ডী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রায় সব কাঁচা রাস্তা পানির নিচে। মাঠ, পুকুর, গাছপালা—সব মিলেমিশে একাকার। কোথাও মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে। কোথাও ঘরের টিনের চালা পানির ওপরে দেখা যাচ্ছে। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ নষ্ট হওয়া জিনিসপত্র খুঁজছেন, কেউ কাদা সরাচ্ছেন।

পানির ওপর দাঁড়িয়ে ছেঁড়া শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে ধরে ছিলেন আশা খাতুন। আঙুল তুলে দেখালেন, যেখানে একসময় তাঁর ঘর ছিল, এখন সেখানে শুধু ঘোলা পানি। মাটির ঘরটা আর নেই। ভেসে গেছে ধানের গোলা, চাল, হাঁস-মুরগি। পুকুরের মাছও বন্যার পানিতে বেরিয়ে গেছে।

ষাটোর্ধ্ব এই নারী বলেন, ‘ও বাপ, আঁর ঘর আর নাই, কিছু বাঁচাইত ন পারি। আঁরা হডে যাইয়ুম, হডে থাইক্কুম, কনে মাথা গুঁইজ্জুম, ন জানি।’

পার্বত্য জেলায়ও একই চিত্র

রাঙামাটিতে পানি কমতে শুরু করায় অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন। তবে জেলার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো রয়েছেন ৩ হাজার ৭৩৯ জন। পানিবন্দী রয়েছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবার। অতিবৃষ্টিতে জেলার সাত উপজেলায় ১৩৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।

বান্দরবানের বালাঘাটা, আর্মিপাড়া, ইসলামপুর, উজানিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় লোকজনকে ঘরের কাদা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। সরকারি হিসাবে এখনো জেলার ৬ হাজার ২৫০ জন আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন।

উজানিপাড়ার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, ঘরের ভেতর এখনো কাদা। পরিষ্কার না করলে সেখানে থাকা সম্ভব নয়। অনেক জিনিসপত্রও নষ্ট হয়ে গেছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা–বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, বন্যাকবলিত এসব মানুষকে এখন জরুরি সহায়তা দেওয়া দরকার। স্থানীয় সরকার কার্যত দুই বছর ধরে অচল হয়ে আছে। তাই দুর্গত ব্যক্তিদের সহায়তায় সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। এসব এলাকার সংসদ সদস্যদের তাঁদের এলাকায় পাঠানো উচিত। তাঁরা গিয়ে দুর্গত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনে সহায়তার বিষয়টি সমন্বয় করবেন। প্রয়োজনে সংসদ অধিবেশন মুলতবি থাকুক।

প্রথম আলো

‘পানি কমছে, লড়াই টিকে থাকার’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ‘সারা জীবন কষ্ট কইরা যেই ঘরডা বানাইছিলাম, অই ঘরখানা নিমিষে ভাইঙা গ্যাছে। অহন পোলা, পোলার বউ আর নাতি–নাতনি লইয়া আমরা ছয়জন মানুষের থাকার আর কোনো ঠাঁই নাই। সব শেষ অইয়্যা গেল।’

কথাগুলো ষাটোর্ধ্ব রানী দেবের। তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জ সদরের সুঘর গ্রামে। বন্যায় তার কাঁচা ঘরটি ভেঙে গেছে। বন্যার পানি কমার পর ভাঙা সেই বাড়িতে ফিরেছেন তাঁরা। তবে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবারটি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজারের ৫৯ উপজেলা বন্যা প্লাবিত হয়েছে। এসব অঞ্চলে বন্যার পানি কমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে ক্ষতির চিত্র। বাসিন্দারা ঘরবাড়িতে ফিরতে শুরু করেছেন। তবে শুরু হয়েছে টিকে থাকার নতুন লড়াই।

কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে এসব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন বলছে, গতকাল সোমবার বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ৫৪ জন মারা গেছেন। পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বন্যার্তদের জন্য এসব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৪৯টি। এখনো সেসব আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ।

এদিকে আরও ৯টি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র। জেলাগুলো হলো সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্র বলছে, ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এসব অঞ্চল বন্যা প্লাবিত হতে পারে।

পানি কমছে, স্পষ্ট হচ্ছে ক্ষতির চিত্র

বন্যার পানি কিছুটা নেমে গেলেও এখনো নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি নওশা মিয়া। এক সপ্তাহ ধরে তিনি আছেন এক আত্মীয়র বাড়িতে। ৭৫ বছর বয়সী নওশা মিয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কাথারিয়া ইউনিয়নে। তিনি বলেন, ‘পানি কমছে ঠিক, কিন্তু ঘরে ফিরলেই তো আর থাকা যায় না। আগে ঘর শুকাতে হবে, কাদা সরাতে হবে। চাল ও দেয়াল মেরামত করতে হবে। তারপর দেখা যাবে কীভাবে আবার সংসার শুরু করা যায়।’

নওশা মিয়ার মতো চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের লাখো মানুষের অবস্থা একই। কোথাও পানি নেমেছে, কোথাও এখনো রয়ে গেছে। তবে ভাঙা ঘর মেরামত, কাদা সরানো, নষ্ট ফসলের ক্ষতি সামাল ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার নতুন এক লড়াই শুরু হয়েছে তাঁদের।

গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লোকজন ঘরের কাদা পরিষ্কার করছেন। কেউ সরাচ্ছেন নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাব। অনেক পরিবার শুধু শুকনা খাবার খেয়েই দিন পার করার কথা জানালেন।

বাঁশখালী উপজেলার ডোংরা এলাকার শাহীন আক্তার বলেন, ‘আঁরা ক্যান গইজ্জুম (কী করব)। ক্যানে ঘর বাইন্দুম। টিঁয়া-পয়সা হডে পাইয়ুম।’

সাতকানিয়ার সদর, সোনাকানিয়া, ছদাহা, মাদার্শা, কেঁওচিয়া, কাঞ্চনা, আমিলাইশের কিছু জায়গা থেকে পানি নেমেছে। লোহাগাড়ার সব ইউনিয়ন থেকেও বন্যার পানি সরে গেছে। তবে অনেক নিচু এলাকা এখনো জলমগ্ন।

কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার বেশির ভাগ এলাকা থেকেও বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ঘরে ফিরছেন বাসিন্দারা।

চকরিয়ার গোবিন্দপুর এলাকার নাছিমা বেগম বলেন, পাঁচ দিন পর গতকাল তিনি ঘরে ফিরে দেখেন মেঝে ধসে গেছে। পুরো ঘর ভরে গেছে কাদায়। কাদা সরিয়ে ঘর বসবাসের উপযোগী করার চেষ্টা করছিলেন।

যুগান্তর

দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘দেশের প্রদীপ জ্বলে বিদেশে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তবে তাদের বড় একটি অংশই পড়াশোনা শেষ করে আর দেশে ফিরছে না। উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার বিস্তৃত সুযোগ, উচ্চ বেতন, স্থায়ী বসবাসের সুযোগ এবং উন্নতমানের জীবন আকর্ষণে তারা বিদেশেই ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। ফলে দেশের তরুণ মেধাবীদের আলোয় আলোকিত হচ্ছে বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, হাসপাতাল, প্রযুক্তিসহ নানা প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে দেশে সীমিত গবেষণা, দক্ষতাসম্পন্ন কর্মসংস্থান সংকট ও অনিরাপদ পরিবেশ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়নের ক্ষেত্র এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। এসব সীমাবদ্ধতায় দেশে ফেরার আগ্রহ কমে যাচ্ছে তাদের। ফলে উচ্চশিক্ষিত মানবসম্পদের একটি বড় অংশ বিদেশে থেকে যাওয়ায় দেশে মেধা পাচারের আশঙ্কা আরও প্রকট হচ্ছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশে ‘রিভার্স ব্রেন ড্রেন’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছু বাংলাদেশির দেশে ফেরার আগ্রহ নতুন আশার জন্ম দিলেও বাস্তবে সেই প্রবণতা এখনো দৃশ্যমান নয়। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার প্রবণতাও।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫২ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে শিক্ষা খাতে বাংলাদেশিদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরে আসেন, সে বিষয়ে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সাধারণত শর্তসাপেক্ষে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষা ছুটি নিয়ে বিদেশে যান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তাদের মধ্যে বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার হার তুলনামূলক কম, যা সংশ্লিষ্টদের মতে প্রায় ২০ শতাংশ। সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২ জন শিক্ষক পিএইচডির জন্য বিদেশে গেলেও তাদের মধ্যে ২৮ জন দেশে ফেরেননি।

অন্যদিকে যারা নিজ উদ্যোগে স্কলারশিপ বা ব্যক্তিগত অর্থায়নে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যান, তাদের ক্ষেত্রে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উন্নত কর্মসংস্থান, গবেষণার সুযোগ ও স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনার কারণে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৬০ শতাংশেরও বেশি পড়াশোনা শেষে আর দেশে ফিরে আসে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা দেন। তাদের মতে, এদের উল্লেখযোগ্য অংশই বিদেশে থেকে যায়।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া কোনো সমস্যা নয়। এটা একটি জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। যদি সেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর মতো পরিবেশ তৈরি হয়। দেশে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা গেলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, দেশের নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, মেধার মূল্যায়ন, গবেষণার স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে তরুণদের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও গবেষণাভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজনে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আল আমিন হোসেন। শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রিচিতা খন্দকার রিফাত। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আনামিকা আহমেদ কাজ করছেন মাইক্রোসফটে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী গাজী মোহাইমিন ইকবাল মেটা এবং ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) শিহাব রশিদ অ্যাপলে কর্মরত রয়েছেন। এভাবে বিশ্বের বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের মেধাবী তরুণরা।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, তাদের ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত শুধু বেশি বেতনের জন্য নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ এবং জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যাওয়া সাইদুর রহমান বর্তমানে সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। তিনি বলেন, পেশাগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিক থেকে আপাতত যুক্তরাজ্যই বেশি সম্ভাবনাময়।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান যুক্তরাষ্ট্রে ডেটা সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা নেওয়া মো. ইউসুফ। পড়াশোনা শেষ করে সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের পরিবেশ নেই। বেতন-ভাতাদিও খুব একটা মানসম্মত নয়। তবে পেশাগত নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ তৈরি হলে ভবিষ্যতে দেশে ফেরার বিষয়টি বিবেচনা করব।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মেধা পাচারের (ব্রেন ড্রেন) অন্যতম কারণ গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত পরিবেশ। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো পরিকল্পিতভাবে বিশ্বের সেরা মেধাবীদের আকৃষ্ট করছে। তাদের অভিবাসন নীতিতে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। কারণ, আধুনিক অর্থনীতিতে জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনই সবচেয়ে বড় সম্পদ। এ কারণে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, হাসপাতাল ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি পেশাজীবীরাও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

তারা বলছেন, ব্রেন ড্রেনের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর। এতে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি তৈরি হয়। অর্থনীতির ভাষায়, এটিই ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল লস’, যেখানে রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তৈরি হওয়া দক্ষ মানবসম্পদের সুফল শেষ পর্যন্ত অন্য দেশ ভোগ করে।

কালের কণ্ঠ

‘বন্যায় বিপুল ক্ষতি, মৃত্যু ৫৪’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা, সিলেটের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ছাড়াও আরো কিছু জেলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বানের পানি কমতে শুরু করেছে এসব জেলায়।

তবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পার্বত্য এলাকা বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আম চাষিরা বানের জল কমার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায় লোকসানের শঙ্কায় আছেন। উপজেলার নতুন পাড়ার আম চাষিরা জানিয়েছেন, বাড়িঘর, বাগান থেকে পানি নামলেও বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। পানি থাকায় বাগানেই পচেছে আম। বন্যা পরিস্থিতিতে বিক্রি করতে পারেননি।

বানের পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বন্যার ছোবলে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোয় ধীরে ধীরে ক্ষতির দগদগে চিহ্ন বের হচ্ছে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতি নিয়ে আছে দুশ্চিন্তায়।

টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চল। চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সোমবার তিন জেলায় তিনটি নদীর পানি চার পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপরে বইছিল। এদিকে বন্যার পানি কমতে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পাচ্ছে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত সাত জেলায় বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ৫৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তার মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামেই প্রাণ হারিয়েছে ৪৪ জন।

এই মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌর এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।

এতে এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন। এই মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ জন মারা গেছে কক্সবাজার জেলায়। কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় নিহত হয়েছে ১৩ জন। চট্টগ্রামেই সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ১৬ হাজার ৮২১ জন আশ্রয় নিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বান্দরবানে ছয়জন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছে; এ জেলায় খোলা হয়েছে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র। রাঙামাটিতে নিহত হয়েছে তিনজন। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় একজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

বহুমুখী ক্ষতি চট্টগ্রামে: আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রাম জেলায় বন্যা ও পাহাড়ধসে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৪ হাজার ২৮১টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি এক হাজার ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম কালের কণ্ঠকে জানান, জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়িঘের এবং প্রায় চার হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯২ কোটি টাকা। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের জেলা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলমগীর জানান, বন্যায় ৬৫টি পোলট্রি খামার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৪৪ হাজার মুরগি। শতাধিক গরু-ছাগল মারা গেছে। গবাদি পশুর শুকনা খাবার নষ্ট হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টন। কাঁচা ঘাসের জমি নষ্ট হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার একর। প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি টাকা।

বান্দরবানের পাঁচ উপজেলায় সড়ক বিধ্বস্ত: বান্দরবান থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বান্দরবানে বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম-ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে প্রধান সড়ক যোগাযোগ। পাহাড়ধস, ভূমিধস, নদীর তীব্র স্রোত ও পাহাড়ি ঢলে জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি, মৎস্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, পর্যটন ও যোগাযোগ খাতে কয়েক শ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক চিত্র উঠে এসেছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের দুর্যোগে পাহাড়ধসে পাঁচজন এবং পানিতে ভেসে এক শিশুসহ মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলার ২৬টি স্থানে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ছয় হাজার ২৫০ জন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে আট হাজার পরিবার। দুর্গতদের সহায়তায় জেলা প্রশাসন এরই মধ্যে আট লাখ ৪০ হাজার টাকা নগদ সহায়তা প্রদান করেছে এবং ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সংযোগ সড়ক পাহাড়ধস ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইত্তেফাক

‘ঢাকার পানি নামার ৪১ স্লুইসগেটের ২২টিই অচল’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানীতে অল্প বা ভারী বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় সড়ক। প্রধান সড়কের পানি কয়েক ঘণ্টায় সরলেও অলিগলিতে পানি নামতে সময় লাগে কয়েক দিন। সম্প্রতি টানা বৃষ্টিতে এই ভোগান্তি আরো বেড়েছে। সিটি করপোরেশন বলছে, নগরবাসী ড্রেনে অতিরিক্ত বাসাবাড়ির কঠিন বর্জ্য ফেলার কারণে ড্রেনগুলো সচল থাকছে না। এতে পানি সরতে সময় লাগছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ড্রেনেজের পাশাপাশি রাজধানীর জলাবদ্ধতার বড় কারণ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অকার্যকারিতা। খাল, স্লুইসগেট, পাম্পস্টেশন ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর বড় অংশ ঠিকমতো কাজ করছে না। ফলে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে প্রতি বছর একই দুর্ভোগের মুখে পড়তে হচ্ছে নগরবাসীকে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টির পানি নদীতে নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান অবকাঠামো ৪১টি স্লুইসগেটের মধ্যে মাত্র ১৯টি কার্যকর রয়েছে। বাকি ২২টির মধ্যে ছয়টি সম্পূর্ণ অচল ও ১৫টি আংশিক সচল থাকলেও কার্যকরভাবে পানি নিষ্কাশনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার এসব স্লুইসগেট পরিচালনার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পর্যাপ্ত জনবলও নেই। একই সঙ্গে রাজধানীর আটটি প্রধান পানি নিষ্কাশন আউটলেটের তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল রয়েছে। অন্য পাম্পগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। ড্রেনে জমে থাকা বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য দুই সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সাকার মেশিনের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল। অন্যদিকে দুই সিটির আওতায় থাকা ২৬টি খালের বড় অংশ পানিপ্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা হারিয়েছে।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, প্রায় ৩০৬.৩৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১২৯টি ওয়ার্ডে প্রায় আড়াই কোটি মানুষের বসবাস। অথচ এই বিশাল এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য কার্যকরভাবে নির্ভর করতে হয় মাত্র আটটি আউটেলেটে। মালিবাগ, শান্তিনগর, পল্টন ও মতিঝিল এলাকার পানি টিটিপাড়া পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে নিষ্কাশিত হয়। পুরান ঢাকা, আজিমপুর, গুলিস্তান ও হাজারীবাগ এলাকার পানি ধোলাইখাল-সূত্রাপুর হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে যায়। গ্রিন রোড, তল্লাবাগ ও পান্থপথ এলাকার পানি হাতিরঝিল হয়ে রামপুরা পাম্প স্টেশনে পৌঁছে। আশুলিয়া এলাকার পানি গোড়ান চটবাড়ি এলাকা দিয়ে, এয়ারপোর্ট এলাকার পানি আব্দুল্লাহপুর আউটলেট, শ্যামলী মোহাম্মদপুর এলাকার পানি কল্যাণপুর এলাকা দিয়ে। আর যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, জুরাইন ও ডিএনডি এলাকার কিছু অংশের পানি শিমরাইল পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীতে নিষ্কাশন করা হয়। এর মধ্যে হাতিরঝিল পরিচালনা করে রাজউক। কল্যাণপুর ও রামপুরা আউটলেট পরিচালনা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ধোলাইখাল ও কমলাপুর-টিটিপাড়া আউটলেট পরিচালনা করে ডিএসসিসি। আব্দুল্লাহপুর ও গোড়ান-চটবাড়ি এলাকার আউটলেট পরিচালনা করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং শিমরাইল আউটলেট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন পরিচালনা করে। এদিকে, কমলাপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন টিটিপাড়া পাম্পস্টেশন দিয়ে প্রতি মিনিটে প্রায় ৮ লাখ ৫৫ হাজার লিটার পানি অপসারণের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু তিনটি বড় পাম্পের মধ্যে একটি প্রায় দেড় বছর ধরে বিকল। সম্প্রতি নতুন পাম্প কেনার জন্য দরপত্র সম্পন্ন হলেও চলমান বর্ষা মৌসুমে সেটি সচল করা সম্ভব হয়নি।

করপোরেশনের প্রকৌশলীদের দাবি, মেগাসিটি ঢাকার জলবদ্ধতা নিরসনে এত কম সংখ্যক আউটলেট পর্যাপ্ত নয়। কিন্তু পাঁচ দশক আগেও নগরীতে যে কয়টি আউটলেট ছিল, এখনো সে কয়টি আউটিলেটের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন হচ্ছে। নগরপিতা পরিবর্তন হলেও কেউ এই বিষয়ে নজর দেয়নি। ডিএসসিসির বিদ্যুত্ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, ধোলাইখালের তিনটি পাম্প সচল থাকলেও টিটিপাড়ার তিনটি পাম্পের মধ্যে একটি নষ্ট রয়েছে। এর জন্য দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে নতুন পাম্প সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ স্লুইসগেটের যান্ত্রিক অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। নদীতে জোয়ারের সময় ব্যাক-ফ্লো ঠেকাতে অনেক সময় স্লুইসগেট বন্ধ রাখতে হয়। তখন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যায়। কিন্তু পাম্পও পুরোপুরি সচল না থাকায় পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। ডিএসসিসির প্রকৌশলীদের দাবি, ওয়াসা থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডে হস্তান্তরের পর দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় স্লুইসগেটগুলোর বর্তমান অবস্থা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘বর্তমান বাস্তবতায় এই মেগাসিটির জন্য মাত্র সাতটি আউটলেট কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে যে স্লুইসগেটগুলো আছে, সেগুলো দ্রুত কার্যকরের পাশাপাশি আরো স্লুইসগেট বাড়াতে হবে। এছাড়া আমাদের কেবল সাময়িক বা আপত্কালীন পাম্পিংয়ের ওপর নির্ভর না করে, দীর্ঘমেয়াদি নগর-পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে।’

ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাজিব খাদেম বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা বর্জ্য ও ব্লকেজ। মানুষ নিয়মিত পলিথিন, প্লাস্টিক, রাবার ও স্পঞ্জ ফেলায় ড্রেন দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। অনেক এলাকার পানি দীর্ঘ পথ ঘুরে নদীতে পৌঁছায় বলেও জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পানি নিষ্কাশনের পথ সংক্ষিপ্ত করা, অকার্যকর স্লুইসগেট মেরামত, পাম্পের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং নতুন সাকার মেশিন সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড্রেন, নালা ও পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পানি জমে থাকা এলাকায় দ্রুত অপসারণে প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি মোতায়েন করা হয়েছে এবং পাম্পগুলো সচল রাখা হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

নয়া দিগন্ত

দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘উজানের ঢল ও বৃষ্টিতে নতুন করে বন্যার শঙ্কা’। খবরে বলা হয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আবারো বন্যার শঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। টানা বর্ষণ এবং ভারতের মেঘালয়, আসাম ও ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে চারটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। এর মধ্যে তিস্তার পানিও গত সন্ধ্যায় বিপদসীমার ১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা ভারী বর্ষণে নগর ও গ্রামীণ জীবনযাত্রা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুমিল্লায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় গতকাল এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় ২৭ ঘণ্টায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের ফলে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢলের পানিতে সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আমাদের স্থানীয় অফিস, জেলা ও উপজেলা সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যে এসব খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে গতকাল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, পাহাড় ধস ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় এ পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। সাতটি জেলায় আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো-খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জেলাগুলোর মোট ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া উপদ্রুত অঞ্চলগুলোর ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চার পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে নদীর পানি: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী গতকাল সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত-

সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমার পানি ছিল বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপরে,
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি ২৭ সেন্টিমিটার ওপরে,
সুনামগঞ্জের মারকুলিতে কুশিয়ারা নদীর পানি ১ সেন্টিমিটার ওপরে এবং
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার ওপরে প্রবাহিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করা মানেই তাৎক্ষণিক বড় বন্যা নয়; তবে যদি উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকে এবং স্থানীয়ভাবে ভারী বর্ষণ হয়, তাহলে নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কেন বাড়ছে নদীর পানিঃ আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, মৌসুমি বায়ু বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে। একইসাথে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এই বৃষ্টির পানি সীমান্তবর্তী নদ-নদী হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। বিশেষ করে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকা সম্পূর্ণভাবে ভারতের উজানের বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। ফলে উজানে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিও বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জে দ্রুত পানি বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।

বণিক বার্তা


‘টানা তিন বছর এইচএসসিতে বন্যার প্রভাব, ২০২৭ সালের পরীক্ষায়ও একই শঙ্কা’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হলেই সামনে আসে নতুন এক উদ্বেগ। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভাবতে হয়—সঠিক সময়ে পরীক্ষা হবে তো, নাকি স্থগিত বা বিঘ্নিত হবে বন্যার কারণে?

কেননা টানা তিন বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে অনুষ্ঠিত এইচএসসিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যার প্রভাব পড়েছে পরীক্ষা কার্যক্রমে। কোথাও পরীক্ষা পিছিয়েছে, কোথাও চরম দুর্ভোগের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের যেতে হয়েছে কেন্দ্রে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু ৬ জুন, শেষ হবে ১৩ জুলাই। অর্থাৎ বর্ষা মৌসুমের মধ্যেই পরীক্ষায় বসতে হবে শিক্ষার্থীদের। ফলে আগামী বছরও বন্যার কারণে তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয় ২ জুলাই। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালে টানা ভারি বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচটি জেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় পাঁচ জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা আসে।

চলমান বৈরী আবহাওয়ায় পরীক্ষা হবে কি হবে না—এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা। এ বিষয়ে গতকাল রাজধানীর বোরহান উদ্দিন কলেজের সামনে কথা হয় আখতার জাহানের সঙ্গে, যিনি মেয়েকে ওই পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে এসেছিলেন। বণিক বার্তাকে এ অভিভাবক বলেন, ‘রোববার সারা দিন প্রচুর বৃষ্টির কারণে বাসার আশপাশের এলাকায় হাঁটুপানি জমে যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও আজ (সোমবার) কোনো রিকশা বা সিএনজি পাইনি। বাধ্য হয়ে হাঁটুপানি ভেঙেই মেয়েকে নিয়ে এগোতে হয়েছে। কিছুদূর আসার পর একটি রিকশা পেলেও গুনতে হয়েছে প্রায় তিন গুণ ভাড়া। এরপর কেন্দ্রে এসেও দেখি আশপাশ জলমগ্ন। মেয়েকে তাই ভেজা পোশাকেই পরীক্ষা দিতে পাঠিয়েছি। এখন সে অসুস্থ হয়ে যাবে কিনা, সামনের পরীক্ষাগুলো ভালোভাবে দিতে পারবে কিনা—এ নিয়ে আমি চিন্তিত।’

শুধু যাতায়াত নয়, পরীক্ষা হবে কিনা—সে অনিশ্চয়তাও বড় চাপ তৈরি করেছে বলে জানান আখতার জাহান। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল (রোববার) সারা দিন মেয়ে আমার সংশয়ে ছিল, পরীক্ষা হবে নাকি স্থগিত হবে। বারবার এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করছিল, কারণ স্থগিত হলে তো পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। আমার মেয়ের মতো আরো অনেক পরীক্ষার্থীই একই সংশয়ে ছিল। এতে তাদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতেও এক ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে শুধু যে যাতায়াতে ভোগান্তি এমন নয়, আমাদের দেশের সড়ক ও বিদ্যুতের লাইনগুলোর যে অবস্থা তাতে দুর্ঘটনার শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।’

শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য বলছে, কভিড মহামারীর আগে এইচএসসি পরীক্ষা সাধারণত এপ্রিলে শুরু হতো। ব্যবহারিক পরীক্ষাসহ পুরো কার্যক্রম শেষ হয়ে যেত জুনের মধ্যেই। ফলে বর্ষার বিস্তারের আগেই পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব হতো।

কভিডের কারণে ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২১ সালের পরীক্ষা হয় ডিসেম্বরে, ২০২২ সালে নভেম্বরে এবং ২০২৩ সালের পরীক্ষা নেয়া হয় আগস্টে। করোনার প্রভাবেই মূলত এ তিন বছর এমনটা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২৪ সালে ৩০ জুন এবং ২০২৫ সালে ২৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু এ দুই বছরই পরীক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে বন্যার কারণে।

২০২৪ সালে বন্যা পরিস্থিতির কারণে স্থগিত করতে হয় সিলেট বিভাগের পরীক্ষা। পরে ৯ জুলাই থেকে ওই বোর্ডে পরীক্ষা শুরু হয়। আর গত বছর কুমিল্লা অঞ্চলে হওয়া ভয়াবহ বন্যার কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর ১০ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

চলতি বছরেও বন্যা পরিস্থিতির কারণে প্রথম ৮ জুলাই চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবন জেলার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয় চট্টগ্রাম ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলো। বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমলেও এখনো জেলাগুলোর বড় অংশের মানুষ পানিবন্দি।

আজকের পত্রিকা


দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘পানিতে ডোবে ঢাকার ১২৯ স্থান’। প্রতিবেদনে বলা হয়, আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টায় থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর অন্তত ১২৯টি স্থানে জলাবদ্ধতায় ভুগেছে মানুষ। গত শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়েছে নগরের নিচু এলাকা। অনেক সড়কের পাশাপাশি কিছু প্রধান সড়কে জমে হাঁটু থেকে কোমরপানি। কোনো কোনো এলাকায় বাসাবাড়িতেও ঢুকেছে পানি।

রোববারের পর গতকাল সোমবারও জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবারও বৃষ্টি থাকবে। ভারী বৃষ্টি হলে আজও কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।

অথচ রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১০ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা খরচ করেছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে অচল হয়ে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৭ স্লুইসগেটের সব কটি। নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পরিকল্পনামাফিক শহরের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, খালসহ অন্যান্য জলাশয় দখল, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কগুলোতে আবর্জনা ও দূষণ জলাবদ্ধতার কারণ।


আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, শনিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম গতকাল রাতে আজকের পত্রিকাকে বলেন, আজ মঙ্গলবারও ঢাকায় বৃষ্টি থাকবে। কাল বুধবার থেকে বৃষ্টি কমে আসবে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত দুদিন সরেজমিনে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে ১২৯ স্থানে জলাবদ্ধতার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৭৯টি এবং ডিএসসিসি এলাকায় ৫০টি স্থান রয়েছে। এসব এলাকার সড়ক, ফুটপাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে ছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কিছু এলাকা থেকে পানি সরে গেলেও অনেক জায়গায় থেকে যায়। তবে সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে ১৫ এবং দক্ষিণে ৩৩টি জলাবদ্ধতার হটস্পট রয়েছে।

ডিএনসিসির ৭৯টি স্থানে জলাবদ্ধতা


ডিএনসিসির যে ৭৯ স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে, সেগুলো হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১, ২, ১০ ও ১১ নম্বর সড়ক; উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ৯, ১০ ও ১১ নম্বর সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ (বিমানবন্দর) সড়ক, খিলক্ষেত, ব্যাপারীপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, কুড়িল, কালশী রোড, মিরপুর সেকশন-১২ মুসলিম বাজার, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১ (প্যারিস), নাখালপাড়া, শাহীনবাগ, রাওয়া ক্লাবের সামনে, পাগলারপুল, খিলগাঁও শিশুচত্বরসংলগ্ন এলাকা, তেজগাঁও সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল, মগবাজারের আমবাগান, মগবাজারের চল্লিশঘর বস্তি, প্রগতি সরণি, বেগম রোকেয়া সরণি, মিরপুর-১-এর কিযাংশি চায়নিজের সামনে, মিরপুর-১-এর দারুস সালাম রোড, টোলারবাগ; মিরপুর রোডের ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকা, কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার, বিজয় সরণি, মনিপুরীপাড়া, ফার্মগেট, উলুদাহা-বাদালদি, তারারটেক, পাবনারটেক, কামারপাড়া, ভাটুলিয়া, ধউর, কাওলা, আশকোনা, দক্ষিণখান প্রধান সড়ক, গণকবরস্থান রোড, প্রেমবাগান আশকোনা, মধ্য আজমপুর, কাঁচকুড়া থেকে ময়নারটেক, আঁটিপাড়া, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাটাগলি, মেডিকেল রোড ও তালতলা রোড, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল্লাহপুর প্রধান সড়ক, ডুমনি বাজার থেকে ৩০০ ফুটসংলগ্ন সড়ক, ভাটারা মন্দির রোড, ঢালিবাড়ি রোড, ব্যাপারীবাড়ি রোড, লতিফ খন্দকার রোড, সাতারকুল প্রধান সড়ক, আনন্দনগর, পশ্চিম পদরদিয়া, পোস্ট অফিস রোড, পূর্বাচল লেন ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬ এবং বছিলা সড়ক। এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মনিপুর, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানীতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

মোহাম্মদপুর বছিলার বাসিন্দা মানিক হোসেন বলেন, বছিলার র‍্যাব অফিসের সামনের রাস্তায় রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটুপানি ছিল। এখনো কিছু জায়গায় পানি রয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘খালগুলো বেদখল হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। তবে আমরা জলাবদ্ধতার হটস্পটগুলো শনাক্ত করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

দেশ রূপান্তর

‘ড্রেনেজ বিপর্যয়ে ডুবছে ঢাকা’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, ভারী বৃষ্টিতে টানা দুই দিন চরম দুর্বিপাকে পড়তে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। বিশেষ করে গত রবিবার দিনভর কার্যত অচল ছিল ঢাকা নগরী। বৃষ্টি কমে আসার পরও তীব্র জলাবদ্ধতা নগরজীবনকে থমকে দেয়। রাজধানীর এমন বেহাল নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্তরা আছেন তোপের মুখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থাই সংকটের মূল কারণ। বর্জ্য, পলিথিন ও দখলের কারণে ড্রেনেজ লাইনের অনেক অংশ কার্যকারিতা হারিয়েছে।

কোথাও সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানি নির্গমন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে কেবল ভারী বৃষ্টি নয়, কোথাও কোথাও সামান্য বর্ষণেও ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।

মাঝারি বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা। আশপাশের সড়কে কোমর সমান পানি জমে যায়। থমকে যায় ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের জীবিকার চাকা। গত রবিবার সারাদিন বন্ধ ছিল এই মার্কেট।

নিউমার্কেট সংশ্লিষ্টরা জানান, বৃষ্টি হলেই এই এলাকায় যেন ছোটখাটো বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিশেষ করে পিলখানা সড়কে দেখা যায় নদীর মতো দৃশ্য। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এক যুগ ধরে তারা জলাবদ্ধতার সমস্যার মধ্যে আছেন, অথচ কর্তৃপক্ষ সমাধানে উদ্যোগ নিচ্ছে না।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পিলখানা ট্র্যাজেডির পর ২০০৯ সালে বিজিবির সদর দপ্তরের ভেতর দিয়ে যাওয়া দুটি ড্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তৃতীয় গেটটিও পলিথিনসহ মার্কেটের নানা আবর্জনায় প্রায় বন্ধ হয়ে আছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের কোনো পথ না থাকায় বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানি নিষ্কাশনের এই পথ বন্ধ থাকায় নিউমার্কেটের পাশাপাশি ধানম-ি হকার্স মার্কেট, ধানমণ্ডি ২৭, আজিমপুর, লালবাগ ও পলাশীসহ আশপাশের এলাকাও এখন জলাবদ্ধতার হটস্পট।

রাজধানীর অন্য এলাকাতেও ধুঁকছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত জায়গা না পেলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকা কংক্রিটে ছেয়ে গেছে। নকশা অনুমোদনের সময় খোলা জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে মানা হচ্ছে না। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নদী-খাল দখল হচ্ছে সমান তালে। তা ছাড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ প্রতিদিন

দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘বন্দি মানুষ বিপর্যস্ত জনজীবন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিভারী বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড় ধসে গতকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪-এ দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া দেশের সাত জেলায় এখনো পানিবন্দি দেড় লাখের বেশি পরিবার। বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। গতকাল বিকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যাসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা বর্তমানে তীব্রভাবে বন্যা উপদ্রুত। সরকারি হিসাবে এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বন্যা ও ভূমিধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কক্সবাজারে। এ জেলায় এ পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। আহত হয়েছে ২৪ জন এবং একজন এখনো নিখোঁজ। অন্যান্য জেলার মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩ জন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

নীলফামারী: টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে আবারও ফুঁসে উঠেছে তিস্তা নদীর পানি। এতে নীলফামারীর তিস্তা তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় নীলফামারীর ডিমলায় ডালিয়া পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ সেন্টিমিটার (বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার) যা বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লালমনিরহাট : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে তিস্তার পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিস্তার পানি বর্তমানে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় লালমনিরহাটের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। যদিও নদীর মধ্যবর্তীতে বসবাস করা চরের প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড।

বগুড়া: উজানের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে বগুড়ায় যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। এ অবস্থায় সারিয়াকান্দি, ধুনট ও সোনাতলা উপজেলায় তীব্র নদীভাঙন শুরু হয়েছে। এতে শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীপারের মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।
বান্দরবান: দুই দিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বান্দরবান জেলার নিম্নাঞ্চল ও সড়ক থেকে বন্যার পানি নেমে গেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পৌর এলাকার আর্মিপাড়া, ভরাখালী, ইসলামপুর, মেম্বারপাড়া, ক্যাচিংপাড়া, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা ও কালাঘাটাসহ কয়েকটি নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নেমে গেছে।

কক্সবাজার: কক্সবাজারের রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে নদীর পানির তীব্র স্রোতে ভেসে নিখোঁজ হওয়া মো. ইব্রাহীমের (১৮) মৃতদেহ ২৪ ঘণ্টা পর গতকাল দুপুরে উদ্ধার করা হয়েছে। সে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের (৪ নম্বর) ওয়ার্ডের মৈষকুম এলাকার সৈয়দ হোসেনের ছেলে। গত রবিবার মৈষকুম এলাকায় একটি বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছিল ইব্রাহীম। এ সময় পা পিছলে সে নিচে নদীর পানিতে পড়ে যায়। টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে নদীতে তীব্র স্রোতে ইব্রাহীম মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়।

ফেনী: টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে মুহুরী নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে দ্রুতই নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। গতকাল বিকাল ৫টার দিকে মুহুরী নদীতে পানির স্তর রেকর্ড করা হয় ১১ দশমিক ৪৫ মিটার। এ সময় নদী বিপৎসীমার ১ দশমিক ১০ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

Ahmad Zafar

৩ ঘন্টা আগে

এতবড় একটা দুর্যোগের পূর্বাভাস থাকা সত্বেও দুর্যোগ মন্ত্রাণালয় কোন আগাম কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারলো না কেন। কারন ইনি তো মপিজ এলাকার, মন্ত্রীর গদীতে বসেই জাতিকে কৃতার্থ করেছেন। দুর্যোগে তার কোন ভূমিকাই নজরে পড়ে নাই। তাই এই মন্ত্রণালয়ে কি অন্য কোন কর্মঠ ব্যক্তিকে বসানো যায় না?

মন্তব্য করুন