বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে গিয়ে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেনি। মূল একাদশ, পরিচিত কৌশল আর অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর আস্থা রেখেই একের পর এক বাধা পেরিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। ফলও মিলেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের মতো ভারসাম্যপূর্ণ ও গতিময় দলের বিপক্ষে সেই একই ছক কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েই এখন আলোচনা তুঙ্গে।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টস মনে করছে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি বলের দখল নয়; বরং দ্রুত ট্রানজিশন, জুড বেলিংহামের বক্স-টু-বক্স বিচরণ এবং হ্যারি কেইনের নিচে নেমে খেলা। তাই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণই হবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই। একই সঙ্গে তারা বলছে, আর্জেন্টিনার উইং-ব্যাকদের আক্রমণে ওঠা এবং দ্রুত পাসের মাধ্যমে প্রান্ত ব্যবহারই ইংল্যান্ডকে চাপে ফেলতে পারে।
সেখানেই স্কালোনির প্রথম ধাঁধা। গত দুই ম্যাচেই লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে শুরু থেকে খেলিয়েছেন তিনি। কিন্তু এনজো ফার্নান্দেজকে তুলনামূলক এগিয়ে খেলানোয় পারেদেসকে প্রায় একাই নিচের অংশ সামলাতে হচ্ছে। ফলে বল হারানোর পর মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে। বেলিংহামের মতো বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের বিপক্ষে এনজোকে আরও নিচে নামিয়ে পারেদেসের সঙ্গে একটি প্রকৃত ডাবল পিভট গড়া আর্জেন্টিনাকে বেশি ভারসাম্য দিতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, রক্ষণভাগ। কেপ ভার্দে, মিসর ও সুইজারল্যান্ড- তিন ম্যাচেই আর্জেন্টিনা একাধিকবার কাউন্টার অ্যাটাকে বিপদে পড়েছে। উইং-ব্যাকরা ওপরে উঠে গেলে সেন্টার-ব্যাকদের সামনে বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে। ইংল্যান্ডের সাকা কিংবা কেইনের মতো খেলোয়াড়দের বিপক্ষে সেই ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে। তাই অন্তত একজন উইং-ব্যাককে সংযত রাখার বিকল্প ভাবতে হতে পারে।
তৃতীয় প্রশ্নটি স্কোয়াড ব্যবস্থাপনা নিয়ে। পুরো টুর্নামেন্টে স্কালোনি মূলত ১৩-১৪ জন ফুটবলারের ওপর নির্ভর করেছেন। অথচ বেঞ্চে আছেন নিকো পাজ, জুলিয়ানো সিমিওনে ও ভ্যালেন্টিন বার্কোর মতো তরুণরা। অপ্টা অ্যানালিস্ট টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই লিখেছিল, ২০২২ সালে যেমন এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ওপর ভরসা করে সফল হয়েছিলেন স্কালোনি, তেমনি এবার নিকো পাজ, সিমিওনে বা বার্কোও ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই অস্ত্র প্রায় অপ্রয়োগই রয়ে গেছে।
চতুর্থ প্রশ্ন, মেসিনির্ভরতা। স্প্যানিশ দৈনিক এল পাইস লিখেছে, আর্জেন্টিনা এখনো অনেকটাই মেসির অনুপ্রেরণা, নেতৃত্ব ও মুহূর্তের জাদুর ওপর নির্ভরশীল। দল জিতছে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সাবলীল ফুটবল খেলতে পারছে না। প্রতিপক্ষ মেসিকে ঘিরে ফেললে বিকল্প সৃজনশীলতার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গত আসরে এই সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন আনহেল ডি মারিয়া। তার অনুপস্থিতিতে উইংয়ে কার্যকর আক্রমণ গড়ে তুলতে পারছে না আর্জেন্টিনা।
ফলে শেষ দুটি ম্যাচে মেসিকে অনেকটা ডানদিকে সরে গিয়ে খেলতে দেখা গেছে। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে ফ্রি রোলেই মেসিকে দেখার সম্ভাবনা বেশি।
সবশেষে রয়েছে স্কালোনির সাহসের পরীক্ষা। দ্য গার্ডিয়ান মনে করিয়ে দিয়েছে, আর্জেন্টিনা শেষ তিন নকআউট ম্যাচের মধ্যে দুটিতে ১২০ মিনিট খেলেছে। ক্লান্তি বাড়ছে, প্রতিপক্ষের মানও বাড়ছে। তাই একই একাদশ ও একই ছকে অনড় থাকা, নাকি তরুণদের ব্যবহার করে নতুন গতি আনাÑ এই সিদ্ধান্তই হয়তো নির্ধারণ করবে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আরেকটি ফাইনালে উঠবে কি না। স্কালোনির সবচেয়ে বড় লড়াই তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নয়, বরং নিজের কৌশলের সঙ্গেই।
