এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতির তাগিদ

এলডিসি-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতির তাগিদ

ফন্ট সাইজ:

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন অর্থনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এটি যেমন দেশের সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, তেমনি সামনে নিয়ে আসছে কঠিন প্রতিযোগিতা ও নতুন বাস্তবতা। শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা ধীরে ধীরে কমে আসবে, আন্তর্জাতিক মান ও পরিবেশগত শর্ত আরও কঠোর হবে, বাড়বে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ অর্থায়ন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বেসরকারি খাত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না।

আগামী এক দশক হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগই এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যেমন; মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ব্যবসা সহজীকরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এলডিসি-পরবর্তী প্রস্তুতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এটিকে ধরে রাখতে হলে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; ওষুধ, কৃষি, মৎস্য, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও উচ্চমূল্যের রপ্তানি পণ্যের দিকে জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রসারণ, রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্য, ব্যবসা সহজীকরণ, কাস্টমস আধুনিকীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, এলডিসি-পরবর্তী অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতায় দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, আধুনিক কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং শিল্প গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে না পারলে এলডিসি উত্তরণের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বৈশ্বিক বাজারে এখন শুধু কম খরচে উৎপাদন করলেই হবে না; পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ, পরিবেশগত মান এবং টেকসই উৎপাদনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, তাই সবুজ অর্থায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব শিল্প, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি গ্রিন ফাইন্যান্স, শিল্পে সবুজ প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগে নীতিগত সহায়তা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশ-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে পরিণত হতে হবে। এজন্য নীতির ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কর ও শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, বন্দর ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, দ্রুত কাস্টমস সেবা, ডিজিটাল বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ নতুন বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

সামনে যে প্রধান চ্যালেঞ্জ:
তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। এছাড়া ইউরোপসহ প্রধান বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলা। ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধি মানার সক্ষমতা বৃদ্ধি। কৃষি ও মৎস্য খাতে আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মান নিশ্চিত করতে হবে। সবুজ অর্থায়ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো। গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) খাতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) দ্রুত সম্পন্ন করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি। দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ব্যবসা সহজীকরণ, কর সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন করতে হবে।

সিএসইআর-এর বিশ্লেষণ:
"এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ: সরকারের করণীয়, বেসরকারি খাতের প্রস্তুতি" শীর্ষক প্রবন্ধে সংস্থাটির চেয়ারপারসন সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের জন্য স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। গত পাঁচ দশকে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং সামাজিক সূচকে ধারাবাহিক সাফল্যের বৈশ্বিক স্বীকৃতি এটি। তবে এই অর্জনে যেমন রয়েছে মর্যাদা, তেমনি যুক্ত রয়েছে এক কঠিন বাস্তবতা। কারণ এলডিসি মর্যাদা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, সহজ শর্তে উন্নয়ন সহায়তা, বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নীতিগত অগ্রাধিকার থেকে বেরিয়ে আসবে। ফলে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেই মর্যাদাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। এলডিসি উত্তরণের সুবিধা-অসুবিধা এবং অন্যান্য দিক নিয়ে ইতোমধ্যে বেশকিছু আর্টিকেল আমরা লিখেছি।

এর মাঝেই স্বস্তির খবর হলো, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে আরও তিন বছর প্রস্তুতির সময় দিয়েছে। তবে, এই সময়কে কোনোভাবেই অতিরিক্ত অবকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় যখন রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে ভবিষ্যতের অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করতে হবে। আজ যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, আগামী দশকের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেকাংশেই তার ওপর নির্ভর করবে।
প্রথমত, বাংলাদেশকে একটি সুস্পষ্ট ও সময়ভিত্তিক জাতীয় উত্তরণ কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বয়ে এমন একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি খাতের দায়িত্ব, সময়সীমা এবং অর্জনের সূচক নির্ধারিত থাকবে। উন্নয়ন পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রায়ই বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব। সেই জায়গাটিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি রপ্তানি খাত। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ এখনও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে যখন বেশিরভাগ বাজারে শুল্ক সুবিধা কমে যাবে, তখন কেবল কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাই আগামী তিন বছরে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। ফার্মাসিউটিক্যালস, তথ্যপ্রযুক্তি, মেডিকেল ডিভাইস, কৃষি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, মৎস্য ও সামুদ্রিক খাদ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ নির্মাণ, চামড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদন শিল্পকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। যে অর্থনীতি যত বৈচিত্র্যময়, বৈশ্বিক ধাক্কা মোকাবিলায় তার সক্ষমতাও তত বেশি।

রপ্তানি বহুমুখীকরণের কৌশলে বাংলাদেশের মৎস্য ও সামুদ্রিক খাদ্য খাত বিশেষ গুরুত্বপূর্ন একটি খাত। বর্তমানে দেশের মৎস্য খাত জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে; জিডিপিতে প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এক-চতুর্থাংশের বেশি অবদান রাখার পাশাপাশি কয়েক কোটি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের উৎস হিসেবে এই খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চিংড়ি, কাঁকড়া, সামুদ্রিক মাছ, কুচিয়া এবং অন্যান্য উচ্চমূল্যের জলজ পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মান নিশ্চিত করা, আধুনিক ফিশ প্রসেসিং শিল্প গড়ে তোলা, কোল্ড চেইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ, ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার শক্তিশালী করা এবং বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা সনদ অর্জনের মাধ্যমে এই খাতকে উচ্চমূল্য সংযোজিত রপ্তানি শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব। একই সঙ্গে ব্লু ইকোনমি, গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ, অ্যাকুয়াকালচার প্রযুক্তি, ব্র্যান্ডিং এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে আগামী দশকে মৎস্য খাত বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের পর অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে পরিণত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করবে।
একই সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। এতদিন এলডিসি পরিচয়ের কারণে বাংলাদেশ যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পেয়েছে, উত্তরণের পর তার অনেকটাই আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য চুক্তি নিশ্চিত করা এখনই জরুরি। পাশাপাশি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্য এশিয়ার উদীয়মান বাজারগুলোতে প্রবেশের জন্য অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতি এবং বাণিজ্যনীতিকে আলাদা করে দেখার সময় এখন আর নেই।
শিল্প খাতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদনশীলতা। এলডিসি সুবিধা হারানোর পর কম মজুরির শ্রমশক্তি আর বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা থাকবে না। তখন প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং উদ্ভাবনই হবে মূল শক্তি। শিল্প কারখানায় অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না।

অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ। বিশ্বের অর্থনীতি দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। সেই বাস্তবতায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ দিয়ে আর প্রতিযোগিতা করা যাবে না। শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, উন্নত যন্ত্র পরিচালনা, ভাষা দক্ষতা এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তির মতো খাতে দক্ষ কর্মী তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে। বিনিয়োগকারীরা কেবল কর ছাড় নয়, নীতির ধারাবাহিকতা, দ্রুত প্রশাসনিক সেবা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ জনবল এবং আইনের সুশাসনকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাই ব্যবসা শুরু, জমি পাওয়া, কর প্রদান, কাস্টমস কার্যক্রম এবং চুক্তি বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও ডিজিটাল করতে হবে।
আর্থিক খাতের সংস্কারও সমান জরুরি। খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং সীমিত দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন শিল্পায়নের বড় বাধা। ব্যাংকিং খাতকে আরও জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে বড় শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য উৎস পায়। কর ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। রাজস্ব বাড়ানোর সহজ উপায় করের হার বৃদ্ধি নয়; বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। আধুনিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাই সবচেয়ে কার্যকর রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলে।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ যে বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, সেগুলোর পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, সমুদ্রবন্দর কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল এসব কেবল উন্নয়নের প্রতীক নয়; এগুলোকে শিল্প, রপ্তানি, বিনিয়োগ ও লজিস্টিকসের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারলেই প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল মিলবে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় পরিবেশ ও জলবায়ুর বিষয়টিকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ইউরোপসহ বিশ্বের বড় বড় বাজার ইতোমধ্যেই কার্বন নির্গমন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং টেকসই সরবরাহ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্প খাতকে এখন থেকেই সবুজ প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণে বিনিয়োগ করতে হবে। ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতা শুধু দামের নয়, টেকসই উৎপাদনেরও।

এই পুরো যাত্রায় বেসরকারি খাতের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক মানের সনদ অর্জন, প্রযুক্তি বিনিয়োগ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং নিজস্ব ব্র্যান্ড গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের আরও সাহসী হতে হবে। একই সঙ্গে সরকারেরও প্রয়োজন নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। সরকার ও বেসরকারি খাত যদি একে অন্যের সাথে অংশীদার হিসেবে কাজ করে, তাহলে উত্তরণের পরবর্তী ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব হবে।

সবশেষে মনে রাখতে হবে, এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ কোনো গন্তব্য নয়; এটি একটি নতুন যাত্রার সূচনা। এই যাত্রায় সফল হতে হলে আগামী তিন বছরকে সংস্কার, দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সময় হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। নীতিগত সিদ্ধান্তে দেরি, বাস্তবায়নে দুর্বলতা কিংবা পুরোনো অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় সংস্কার, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতমুখী বিনিয়োগ বাংলাদেশকে এমন এক অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন