মেক্সিকো সিটির উচ্চতা পেরিয়ে মায়ামির ভ্যাপসা গরম- কোনো কিছুই যেন থামাতে পারছে না জুড বেলিংহ্যামকে। রাউন্ড অব সিক্সটিনের পর এবার কোয়ার্টার ফাইনালে ভেলকি দেখালেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ইংল্যান্ডকে তুলে নিলেন সেমিফাইনালে। যেখানে থ্রি লায়ন্সদের প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের ৬০ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা ঘোচানোর যে স্বপ্ন এখনো টিকে রয়েছে, তার নেপথ্যে বেলিংহ্যাম।
ম্যাচের প্রথমার্ধে ৩৬ মিনিটে আন্দ্রেয়াস জেলদারুপের গোলে এগিয়ে যায় নরওয়ে। তবে প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে বেলিংহ্যামের গোলে সমতায় ফেরে ইংল্যান্ড। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলই গোল করার জন্য মরিয়া থাকলেও নির্ধারিত সময়ে জয়সূচক গোল আসেনি। অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচের ভাগ্য। অতিরিক্ত সময়ের তৃতীয় মিনিটে (৯৩তম মিনিট) মর্গান রজার্সের দূরপাল্লার শট নরওয়ের গোলরক্ষক নালান্দ ঠিকমতো আটকাতে পারেননি। হাত ফসকে বল বেরিয়ে গেলে সুযোগ বুঝে জয়সূচক গোলটি করেন বেলিংহ্যাম।
এই বিশ্বকাপে বেলিংহ্যাম যেন অপ্রতিরোধ্য। ১৯৮৬ সালে দিয়েগো মারাডোনার পর টানা দুই নকআউট ম্যাচে দুই বা তার বেশি গোল করা প্রথম ফুটবলার বেলিংহ্যাম। মাত্র ২৩ বছর বয়সে এই কীর্তি গড়ে পেলের পর এখন দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় তিনি। ১৯৫৮ সালে সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে একই কীর্তি গড়েছিলেন পেলে। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। নরওয়ে ম্যাচে ইংল্যান্ডের হয়ে পুরো মাঠেই দাপট দেখান বেলিংহ্যাম। সর্বোচ্চ পাঁচটি শট, প্রতিপক্ষের বক্সে সবচেয়ে বেশি বল স্পর্শ (৬ বার) ও সবচেয়ে বেশি ফাউলের শিকার হন (৪ বার)। জুড বেলিংহ্যাম কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের হয়ে ছয়টি গোল করেছেন। ২৩ বছর বা তার কম বয়সী খেলোয়াড়দের মধ্যে শুধুমাত্র কিলিয়ান এমবাপ্পেই (১২টি) তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন। সাবেক বরুশিয়া ডর্টমুন্ড সতীর্থ ও নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং ব্রট হালান্দ ম্যাচ শেষে বেলিংহ্যামের পারফরম্যান্সে প্রশংসা করেছেন।
নরওয়েজিয়ান এই স্ট্রাইকার মনে করেন, ইংল্যান্ড ভাগ্যবান যে তাদের দলে রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার রয়েছেন। হালান্দ বলেন, ‘আমাদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব রয়েছে। আজ সে দুটি গোল করেছে এবং যেভাবে খেলেছে, তাতে আমি মোটেই অবাক নই। আমার মতে, সে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। একজন মিডফিল্ডার হয়েও সে নিয়মিত গোল করছে। মাঠের সব খেলোয়াড়কে অনায়াসে ড্রিবল করে কাটিয়ে যাচ্ছে। জুডকে নিয়ে প্রশংসার ভাষা নেই, সে সত্যিই অবিশ্বাস্য। ইংল্যান্ড সত্যিই ভাগ্যবান। কারণ যে কেউ চাইবে তাদের দলে এমন একজন জুড থাকুক।’ ইউরো ২০২৪-এ স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত ওভারহেড কিকে গোল করে ইংল্যান্ডকে বিদায়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন বেলিংহ্যাম। এরপর চোট আর কোচ টমাস টুখেলের একাদশ থেকে বাদ পড়ার মতো ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এই বিশ্বকাপে যেন পুনর্জন্ম হয়েছে তার। জাতীয় দলের হয়ে করা বেলিংহ্যামের ১২ গোলের ৯টিই এসেছে বড় টুর্নামেন্টে। এর মধ্যে ৫টি গোল দলকে এগিয়ে দিয়েছে। ২টি ছিল সমতাসূচক।
ইংল্যান্ডের হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ নন-পেনাল্টি গোলের তালিকায় বেলিংহ্যামের সমান শুধু গ্যারি লিনেকার। যিনি ১৯৮৬ সালে করেছিলেন ৬ গোল। টুর্নামেন্ট এখনো শেষ হয়নি। বেলিংহ্যামের সামনে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও আছে। সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে ৮ গোল করে ফেলা ৩৯ বছর বয়সী মেসি এখনো আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা। আটলান্টায় বুধবারের সেমিফাইনালে দুই ‘নাম্বার টেন’ বেলিংহ্যাম ও মেসির লড়াই ঠিক করে দিতে পারে ফাইনালের পথ। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বাধা পেরোতে হবে ইংল্যান্ডকে, এরপর অপেক্ষা করছে স্পেন কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। ১৯৬৬ সালের ৩০শে জুলাই কোচ স্যার আলফ রামসের হাত ধরে সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল ইংল্যান্ড। সেই দীর্ঘ ৬০ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর স্বপ্ন- ‘ইটস কামিং হোম’- এখনো বেঁচে আছে। তার অন্যতম ভরসা এখন জুড বেলিংহ্যাম।
