হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী একটি জাহাজে ইরানের হামলার পর দেশটিতে নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন আগ্রাসনের জবাব কঠোরভাবে দেয়া হবে। এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইআরজিসি দাবি করে, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনও জানায়, তারা ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোকাবিলা করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
এর আগে সপ্তাহের শুরুতে তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে, যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে এটি তাদের তৃতীয় দফার হামলা। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি জাহাজে আইআরজিসি প্রকাশ্য হামলা চালানোর পরই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সেন্টকম জানায়, ইঞ্জিন কক্ষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাহাজটি আর যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেনি। এছাড়া একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
বৃটেনের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে যে জাহাজের ক্রুরা জাহাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং বর্তমানে একটি লাইফবোটে অবস্থান করছেন। এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলার জন্য জবাবদিহির পর ইরানকে সমঝোতা স্মারক মেনে চলার আরেকটি সুযোগ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা আবারও তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেই বিবৃতিটি শেয়ার করে লিখেছেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার তাদের মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলে একাধিক উপকূলীয় ঘাঁটি ও টেলিযোগাযোগ টাওয়ারে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইরান জানায়, তাদের পাল্টা অভিযানের প্রথম ধাপে জর্ডানের প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই ঘাঁটির কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার এবং এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ
রোববার এর আগে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, অনুমোদনহীন রুট দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা একটি জাহাজের দিকে নৌবাহিনীর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, বারবার নির্দেশনা অমান্য করায় জাহাজটিকে সতর্কতামূলক গুলিতে আঘাত করে থামিয়ে দেয়া হয়েছে। তারা আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, প্রণালি বন্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিলে তার জবাব চরম কঠোরতার সঙ্গে দেয়া হবে এবং এ অঞ্চলে থাকা নতুন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হবে। আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে হলে তাদের নির্ধারিত রুট অনুসরণ করতে হবে।
উত্তেজনার শুরু
সপ্তাহের শুরুতে ওমানের জলসীমা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশ করা রুটে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী জাহাজে হামলা হয়। ইরান বারবার দাবি করে আসছে, তাদের জলসীমার ভেতর দিয়ে নির্ধারিত রুটই একমাত্র নিরাপদ পথ। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় ১৭ জন নিহত ও ১১৫ জন আহত হন বলে জানিয়েছে ইরানি কর্মকর্তারা। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি হামলার পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের হামলার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেন, সমঝোতা ভঙ্গ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প বলেছেন, আলোচনা এখনও চলবে এবং মধ্যস্থতাকারীরা শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ইরান মার্কিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছে যে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা ছিল একটি ভুল, যার জন্য তারা একটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তারা ইরানের কাছে দাবি জানিয়েছেন, তেহরান যেন প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রতিশোধের অঙ্গীকার
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি নেতৃত্ব গ্রহণের পর প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্যে প্রতিশোধের আহ্বান জানানোর পরই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসে। তার পিতা ও পূর্বসূরি আলি খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের প্রথম দিনে বিমান হামলায় নিহত হন। শুক্রবার তাকে তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, প্রতিশোধ নেয়া জাতির ইচ্ছা। তিনি বলেন, শহীদ নেতার রক্ত এবং এই দুই যুদ্ধে নিহত সব শহীদের রক্তের প্রতিশোধ আমরা সেই অপরাধী ও লাঞ্ছিত হত্যাকারীদের কাছ থেকে নেব।
