হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙ্গে ৩০ গ্রাম প্লাবিত

ফন্ট সাইজ:

কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে। এতে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে হাজারো মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। এরপর পানির প্রবল চাপে প্লাবিত হতে থাকে গ্রামের পর গ্রাম। এ পর্যন্ত জেলার ৩৫টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত এলাকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ না পৌছায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পানিবন্দি মানুষ। এতে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন দুর্গত এলাকার মানুষ।

অন্যদিকে নতুন করে আরও কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভাঙার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। অবৈধ বালু উত্তোলনসহ সময়মত মেরামতের অভাবে খোয়াই নদীর বাঁধের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার তেঘরিয়া ইউনিয়নের ভাদৈ ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ, বালুর বস্তা ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। শুক্রবার এ ভাঙ্গন পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ। পরে শনিবার আবারও পরিদর্শনে গিয়ে জরুরী ভিত্তিতে মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারী অনুদানের ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে আশ্বস্থ করেন তিনি।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বন্যার পানি আশপাশের গ্রামগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে নিম্নাঞ্চলের অসংখ্য বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যায়। অনেক পরিবারের ঘরে কোমরসমান পানি উঠে যাওয়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বানিয়াচং উপজেলার রাধাপুর এলাকায়ও খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বন্যার পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা গবাদিপশু, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড় ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। এতে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়। শনিবার সকালে বানিয়াচংয়ের এ ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক আহমেদ আলী মুকিব। বাঁধ মেরামতের জন্য তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং ক্ষতিগ্রস্থদের আর্থিক সহযোগীতা করেন।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৪শ’ ৪৫ জন পানিবন্দি রয়েছেন। বন্যায় ২৮ হাজার ১৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ২টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩০০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের সহায়তায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫ লাখ টাকা, ১০০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনা খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৯টি উপজেলায় ১ হাজার ৬২০ প্যাকেট শুকনা খাবার উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ লাখ টাকা ও ২০ মেট্রিক টন চাল, বানিয়াচং উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ মেট্রিক টন চাল এবং বাহুবল উপজেলায় ৫০ হাজার টাকা ও ৫ মেট্রিক টন চাল উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত মুড়ি, চিড়া, আলু, ডাল, বিস্কুট ও মোমবাতি সমন্বয়ে ১ হাজার ৫২টি ত্রাণ প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের মজুদে রয়েছে ৩ লাখ টাকা, ৭০ মেট্রিক টন জিআর চাল এবং ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রশাসনের ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মইনুল ইসলাম, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আবু জাহেরসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।এদিকে শুক্রবার বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ। সদর উপজেলার ভাদৈ খোয়াই নদীর ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ, কালিগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভাঙা ও প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন শেষে জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে বন্যাকবলিত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার ও তিনি ব্যক্তিগতভাবে থাকবেন বলেও আশ্বাস দেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো সংস্কার কিংবা প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের দাবি, আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতো। এলাকাবাসী দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ, উদ্ধার কার্যক্রম এবং চিকিৎসা সেবা জোরদারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের কারণে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃস্টি হয়েছে। তিনি জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন। ভেঙ্গে যাওয়া বাঁধ দ্রুত মেরামতের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন