পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, খাদ্য-বিশুদ্ধ পানির সংকট

বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ভয়াবহ বন্যা

পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ, খাদ্য-বিশুদ্ধ পানির সংকট

ফন্ট সাইজ:

টানা ছয় দিনের অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও হাটহাজারীসহ অন্তত ১৫টি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

বন্যার পানিতে হাজার হাজার বসতঘর তলিয়ে গেছে। বহু কাঁচা ও মাটির ঘর ধসে পড়েছে। অধিকাংশ এলাকায় রান্না করার সুযোগ নেই। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে গেলেও অসংখ্য মানুষ এখনো ঘরবাড়িতে অথবা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্লাবিত এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতেও বিঘ্ন ঘটছে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতকানিয়ার পাশাপাশি বাঁশখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও হাটহাজারীর বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে রয়েছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্যের সংকট দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আবারও ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়েছে সাতকানিয়া। উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় নতুন নতুন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতকানিয়া আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সার্কেল কার্যালয়, পৌরসভা এবং থানায় বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ডলু নদী দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে পৌরসভার রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। উপজেলার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

বাঁশখালী উপজেলায় বন্যার পানিতে প্রায় পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ধসে পড়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেলে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পুইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, ‘কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে অধিকাংশ এলাকা ডুবে গেছে। বসতঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্নাবান্না করা যাচ্ছে না। মানুষ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য চরম কষ্টে রয়েছে।’

তিনি জানান, ডলু নদীর পাহাড়ি ঢলের তোড়ে রামপুর এলাকায় কয়েকশ ফুট বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। অনেক এলাকায় এখনো পানি বাড়ছে।

শঙ্খ নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে লোকালয়ে প্রবেশ করায় চন্দনাইশ উপজেলার দুটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের হাশিমপুর এলাকায় প্রায় দেড় ফুট পানি প্রবাহিত হওয়ায় দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক ও ছোট যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘ যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন যাত্রীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা আজগর বলেন, ‘প্রতিদিনই পানি বাড়ছে। অনেক মানুষ খাবার না পেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা জানান, প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৬ হাজার ৫৯১ হেক্টর আউশ ধান, ৫৬৫ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং ৪ হাজার ১৬৭ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের মৎস্য খাতও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নের হাজার হাজার পুকুর, দিঘি, মাছের খামার ও চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে চাষকৃত মাছ ও কোটি কোটি টাকার পোনা।

মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৭ হাজার ৩৭৫টি পুকুর-দিঘি ও ৪৫টি চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০৫ টন মাছ এবং ৪৮ লাখ ৪০ হাজার পোনা ভেসে গেছে। প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের সমন্বিত আরেকটি জরিপে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জলাশয়ের মোট আয়তন প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯১ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পটিয়া উপজেলায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর, দিঘি ও মাছের প্রকল্প প্লাবিত হয়েছে।

খরনা ইউনিয়নের মৎস্যচাষী রকিবুল জানান, তার একটি বড় মাছের প্রকল্প ও ছয়টি পুকুরের সব মাছ ভেসে গেছে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সাতকানিয়ার বাজলিয়া এলাকার মৎস্যচাষী আবুল মনসুর বলেন, ‘তার পাঁচটি পুকুরের সব মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। ক্ষতির পরিমাণ ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।’ স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার অধিকাংশ মাছের প্রকল্প একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাঁশখালীতে শত শত পুকুর ও কয়েক ডজন চিংড়ি ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক খামারির কয়েক হেক্টরজুড়ে থাকা ঘেরের সব মাছ ভেসে গেছে। কারও ক্ষতির পরিমাণ এক কোটি টাকারও কাছাকাছি ।

হালদা নদী থেকে সংগ্রহ করা মূল্যবান রেণুপোনা লালন-পালন করা হচ্ছিল হাটহাজারীর বিভিন্ন পুকুরে। কিন্তু বন্যার পানিতে প্রায় সব রেণুপোনা ভেসে গেছে। এতে হালদাভিত্তিক মাছচাষ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

চন্দনাইশে ৩৩৮টি মাছের পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৯২ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে যাওয়ায় উপজেলা মৎস্য বিভাগ প্রাথমিকভাবে ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ক্ষতির হিসাব করেছে।

আনোয়ারার কালাবিবির দিঘির মোড়ের পাইকারি মাছের আড়তের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আগামী দুই থেকে তিন মাস মিঠাপানির মাছের সরবরাহ কমে যেতে পারে। ফলে বাজারে মাছের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু রাখা হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পানি নেমে গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন