বিশ্বকাপ নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সকে কীভাবে বিশেষায়িত করা যায়? দুর্দান্ত কামব্যাক নাকি ভাগ্যের সহায়তায় উতরে যাওয়া? লিওনেল মেসিরা আসলে দুটোকেই একবিন্দুতে মেলাতে পেরেছিলেন। আর তা পেরেছিলেন বলেই তারা আজ শেষ আটে। তবে নার্ভ ধরে রাখার টানা দুই পরীক্ষায় পাস করলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে লিওনেল স্কালোনির কৌশলে নজর সবার। আগামীকাল সকাল ৭টায় কানসাস সিটিতে সুইসদের মোকাবিলা করবে মেসি অ্যান্ড কোং। যাদের বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের কখনো হারের নজির নেই। তবুও ইউরোপের অন্যতম সংগঠিত দলটির বিপক্ষে অনেক হিসাবনিকাশ করেই মাঠে নামতে হচ্ছে আর্জেন্টিনাকে।
চলতি আসরে অংশ নেয়া দলগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী মাঝমাঠ সুইজারল্যান্ডের। শেষ ষোলোতে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ১২০ মিনিটেও গোল হজম করেনি মুরাত ইয়াকিনের দল। টাইব্রেকার পরীক্ষায় উতরে ৭২ বছর পর কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় সুইজারল্যান্ড। তদের বিপক্ষে কি শুধু মাঝমাঠ কেন্দ্রিক আক্রমণ কৌশলে সফল হতে পারবে আর্জেন্টিনা, নাকি বিকল্প কোনো পথ বেছে নেবেন স্কালোনিÑ সেটাই বড় প্রশ্ন। সেই কৌশলের প্রথম ইঙ্গিত অবশ্য মিলেছে সম্ভাব্য একাদশেই। আর্জেন্টাইন সাংবাদিক গাস্তন এদুল জানিয়েছেন, লেয়ান্দ্রো পারেদেস, নিকোলাস তালিয়াফিকো ও হুলিয়ান আলভারেজের
শুরুর একাদশে থাকা নিশ্চিত। অর্থাৎ, বড় কোনো পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন না স্কালোনি। মিশরের বিপক্ষে যে কাঠামোতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল দল, সেটিকেই আরও পরিণতভাবে কাজে লাগাতে চান তিনি। বিশেষ করে পারেদেসের উপস্থিতি হতে পারে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত। মিশরের বিপক্ষে ৯৭ শতাংশ একুরেসি রেটে ১১৫টি সফল পাস দেন পারেদেস। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় ছিল তার ডিফেন্সিভ ভূমিকা। ডিফেন্সের সামনে থেকে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারকে সামনে ওঠার স্বাধীনতা দিয়েছেন পারেদেস। এমনকি ম্যাচের শেষ দিকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে আক্রমণে পাঠানোর পর রক্ষণে নেমে কার্যত সেন্টার-ব্যাকের ভূমিকাও পালন করেন তিনি। সুইজারল্যান্ডের তিন মিডফিল্ডারের বিপক্ষে এই ভারসাম্যই হতে পারে আর্জেন্টিনার প্রধান অস্ত্র।
তবে পারেদেস মাঝমাঠ সামলালেও আর্জেন্টিনার বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে আক্রমণের ধরন নিয়ে। চলতি বিশ্বকাপে স্কালোনি কোনো স্বীকৃত উইঙ্গার নিয়ে আসেননি। ফলে বেশির ভাগ আক্রমণ গড়ে উঠছে মেসি, ডি পল, এনজো ও ম্যাক অ্যালিস্টারের ছোট ছোট পাসের সমন্বয়ে। কিন্তু শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশর মাঝখান এতটাই শক্তভাবে ব্লক করে রেখেছিল যে দীর্ঘ সময় কার্যকর সুযোগই তৈরি করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা। ফুটবলের কৌশল বিশ্লেষণভিত্তিক ওয়েবসাইট ট্যাকটিকাল ফুটবল অ্যানালাইসিস-এর মূল্যায়নও একই। তাদের মতে, মাঝখানের করিডোর বন্ধ করে মিশর আর্জেন্টিনার বিল্ড-আপের ধার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিল। বলের দখল থাকলেও শেষ তৃতীয়াংশে জায়গা খুঁজে পেতে ভুগতে হয় স্কালোনির দলকে। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে বদলে যায় চিত্র। মাঝমাঠ ছেড়ে মেসি আরও বেশি ডান প্রান্তে সরে যেতে শুরু করেন। এতে মিসরের রক্ষণ চওড়া হতে বাধ্য হয়, মাঝখানে তৈরি হয় ফাঁকা জায়গা। সেই পরিবর্তনের ফলও আসে দ্রুত। ডান দিক থেকে মেসির বাড়ানো ক্রস থেকেই আসে রোমেরোর গোল, যা আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সূচনা করে।
ফিফা ট্রেনিং সেন্টারের ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে, স্কালোনির দল প্রায়ই মেসিকে ডান দিকের হাফ-স্পেসে নিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টা করে। এতে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি হয়। এবার সেই পরিকল্পনাই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ মুরাত ইয়াকিনের সুইজারল্যান্ডও মাঝমাঠে ঘন ব্লক তৈরি করে খেলতে অভ্যস্ত। তাই আবারো যদি
মাঝখানেই আটকে যায় আর্জেন্টিনা, তবে মিশরের ম্যাচের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। অন্যদিকে শুরু থেকেই যদি ডান প্রান্তে মেসির বিচরণ বাড়ে এবং নাহুয়েল মলিনা বা ফুল-ব্যাকদের ওভারল্যাপ বেশি দেখা যায়, তাহলে সুইস রক্ষণকে ছড়িয়ে
দেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে ‘নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যাচ’ নিয়ে সুইসদের ভাবনাও কম নয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এর আগে ৭ ম্যাচ খেলে কোনো জয় পায়নি সুইজারল্যান্ড (ড্র দুটি)। ১৯৬৬ ও ২০১৪ বিশ্বকাপেও হেরেছিল আর্জেন্টিনার কাছে। শেষবার ১৪’র শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার সঙ্গে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়েছিল তারা। আনহেল ডি মারিয়ার ১১৮তম মিনিটের গোলে হৃদয় ভাঙে সুইদের। কানসাস সিটিতে ইতিহাস পাল্টে দিতে চান মুরাদ ইয়াকিন। বলেছেন, আর্জেন্টিনাকে হারানো
অসম্ভব নয়।
