মেসি আছে বলেই সুইসদের যত ভয়

মেসি আছে বলেই সুইসদের যত ভয়

ফন্ট সাইজ:

৭৮-৯১ মিনিট। মাত্র ১৩ মিনিটের ব্যবধানে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুললেন লিওনেল মেসি। কোনো কিছুই হতে না যাওয়া ম্যাচে নিজে গোল করলেন, করালেন সতীর্থকে দিয়ে। হারতে বসা ম্যাচে তিনিই মোমেন্টাম এনে দিলেন। সব বিতর্ক একপাশে রেখে আর্জেন্টিনাকে টেনে তুললেন কোয়ার্টার ফাইনালে। আগামীকাল সকালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ কোয়ার্টার ফাইনাল।

এর মাঝেই ফিফা’র অফিশিয়াল পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বিশ্বকাপে মাঠের পারফরম্যান্সে ফুটবলাররা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলছেন কোচ লিওনেল স্কালোনির ফুটবল দর্শন। টুর্নামেন্টের কোনো কোনো ম্যাচে হয়তো তাদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছে; যেমনটা দেখা গেছে মিশরের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়ের ম্যাচে; তা সত্ত্বেও নিজেদের চেনা ছন্দ ও শক্তি ধরে রেখেছে আলবিসেলেস্তেরা। যেখানে দলটির আশা ভরসার প্রতীক হয়ে আছেন একজন ‘মেসি’।

ফিফা’র অফিশিয়াল র‌্যাঙ্কিং ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রমণাত্মক ফুটবল এবং বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দক্ষতায় টুর্নামেন্টের অন্য যেকোনো দলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এই মুহূর্তে তিনটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে তারা: সর্বোচ্চ গোল, সর্বোচ্চ পাস এবং পাসের নির্ভুলতা। প্রথম পরিসংখ্যানটি প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের ভয়ঙ্কর রূপকে তুলে ধরে। ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথভাবে চলতি বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪ গোল করেছে আর্জেন্টিনা। আর এই গোলবন্যার সিংহভাগ কৃতিত্ব লিওনেল মেসির, যিনি ইতিমধ্যে ৮ গোল করেছেন। আছে গোলদাতাদের তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে। তবে যে দু’টি পরিসংখ্যান স্কালোনির দলের আসল খেলার ধরন বা ‘আইডেন্টিটি’ প্রকাশ করে, তা হলো পাসিংয়ের সংখ্যা ও এর কার্যকারিতা। ফিফা’র তথ্যমতে, পুরো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশি পাস সম্পন্ন করেছে; যার সংখ্যা ৩ হাজার ৪৪৬টি। এই তালিকায় ৩ হাজার ৩৮২টি পাস নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে স্পেন এবং ৩ হাজার ১২৬টি পাস নিয়ে তৃতীয় মরক্কো। শুধু পাসের সংখ্যার দিক থেকেই নয়, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে নিখুঁতভাবে সতীর্থদের কাছে বল পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও শীর্ষে আলবিসেলেস্তেরা। ৯১ শতাংশ পাসের সফলতার হার নিয়ে তারা টেবিলের সবার উপরে। মেসি ৫ ম্যাচে এখন পর্যন্ত ১৯২টি মোট পাস দিয়েছেন, যার মধ্যে ১৫৯টি পাসই ছিল নিখুঁত (পাসের সফলতার হার ৮২%)। এই আসরে তিনি ১৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। আর্জেন্টিনার সমান স্পেনও ৯১ শতাংশ নিখুঁত পাস দিয়েছে, তবে সংখ্যার বিচারে তারা আর্জেন্টিনার চেয়ে পিছিয়ে। আর ৮৯ শতাংশ নিখুঁত পাস নিয়ে এই তালিকার তিনে মরক্কো।

এই পরিসংখ্যান পরিষ্কার প্রমাণ করে যে, আর্জেন্টিনা কেবল মাঠ জুড়ে বলের আদান-প্রদানই বেশি করছে না, বরং পাস দেয়ার ক্ষেত্রে ভুলও করছে সবচেয়ে কম। এটিই স্কালোনির ফুটবল দর্শনের মূল ভিত্তি; যেখানে দল বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রাখবে এবং বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ না হারিয়েই প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালাবে। মজার বিষয় হলো আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরে কিছু বিতর্কও ডালপালা মেলেছে। বিশেষ করে মিশর ম্যাচের পর আফ্রিকান দেশটি অভিযোগ তোলে যে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে ফিফা ও রেফারিরা বাড়তি সুবিধা দিচ্ছেন। মিশরের একটি গোল ভিএআরের মাধ্যমে বাতিল হওয়া এবং মেসি বেশি ফাউল করলেও আর্জেন্টিনা কম হলুদ কার্ড (গড়ে প্রতি ১৯.৭টি ফাউলে ১টি কার্ড) পাওয়ায় সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন। তবে ফিফা’র রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সব সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই নিরপেক্ষভাবে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোয়ার্টার ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার কিছু দুর্বলতাও চোখে পড়েছে। আর্জেন্টিনার বর্তমান রক্ষণভাগ প্রতিপক্ষের গতিশীল এবং কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। কেপ ভার্দে ও মিশরের ফরোয়ার্ডরা যখনই গতি বাড়িয়ে কাউন্টার অ্যাটাকে উঠেছে, তখনই ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও নিকোলাস ওটামেন্ডিদের ডিফেন্স লাইন ভেঙে পড়েছে। তাছাড়া দলটির স্কোয়াডের ওপর বার্ধক্য ও ক্লান্তির একটা প্রভাব দেখা গেছে। পেনাল্টি ও স্পট-কিকের পুরনো দুর্বলতা চোখে পড়েছে।

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে ৩টি পেনাল্টি পেলেও তার মধ্যে লিওনেল মেসি ২টিতেই গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পর মেসি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি দলকে হতাশ করেছিলেন। নকআউট পর্বের বড় ম্যাচগুলোতে পেনাল্টি মিসের এই প্রবণতা দলটিকে যেকোনো মুহূর্তে ছিটকে দিতে পারে। এসব আলোচনার পরেও আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখতে হচ্ছে। কারণ তাদের একজন মেসি আছে। মেসি এরইমধ্যে প্রমাণ করেছেন বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র। ৩৯ বছর বয়সেও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দেখিয়ে চলেছেন, কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। গোল, অ্যাসিস্ট, খেলা নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ সৃষ্টি কিংবা নেতৃত্বÑ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি রয়েছেন নিজের সেরার কাছাকাছি। এবারের বিশ্বকাপেও মেসি আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের মূল ভরসা। টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৮ গোল করে ফ্রান্সের এমবাপ্পের সঙ্গে তিনিও সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছেন। শুধু গোলই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তার অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। নকআউট পর্বে মিশরের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে দলের ৩-২ ব্যবধানের জয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। মেসির পারফরম্যান্সের সবচেয়ে বড় দিক হলো ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার প্রভাব। যখনই আর্জেন্টিনা চাপে পড়েছে, তখনই বল পায়ে দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন অধিনায়ক। তার নিখুঁত পাস, ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে বারবার বিপাকে ফেলেছে। এই বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার পাঁচ ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব ওঠে তার হাতে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড নিজের করে নেয়ার পাশাপাশি তিনি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায়ও নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। প্রতিটি ম্যাচেই নতুন কোনো না কোনো কীর্তি গড়ে নিজের কিংবদন্তি ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। মাঠে নামার আগে তাকে সমীহ করেন প্রতিপক্ষ দলের ফুটবলারাও।

কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সুইজারল্যান্ড অধিনায়ক গ্রানিত জাকা বলেন, ‘৯০ মিনিট, এমনকি ১২০ মিনিটও তাকে থামিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি-না, আমি জানি না। তবে আমার জন্য এবং যারা মেসির যুগে খেলছি, তাদের সবার জন্য এটি একটি বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়।’ সাবেক আর্সেনাল ও বেয়ার লেভারকুসেন মিডফিল্ডার আরও বলেন, ‘তার বিপক্ষে খেলতে পারা একটি সৌভাগ্য। মেসির যুগে খেলতে পারা সৌভাগ্যের, আর তার ইতিহাসের অংশ হতে পারাটাও সৌভাগ্যের। তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।’


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন