উত্তর সাগরের ঢেউ একসময় শুধু বাণিজ্যের বার্তা দিতো না, সঙ্গে আনতো আতঙ্কও। নরওয়ের ভাইকিংরা শত শত বছর ধরে ইংল্যান্ডের উপকূলে হামলা চালিয়েছে, লুট করেছে জনপদ, বদলে দিয়েছে একটি রাজ্যের ইতিহাসের গতিপথ। সেই দুই প্রতিপক্ষ আবারও মুখোমুখি। এবার তলোয়ার কিংবা যুদ্ধজাহাজ নয়, লড়াই হবে মিয়ামির সবুজ গালিচায়। ফুটবল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের টিকিটের জন্য লড়বে ইংল্যান্ডে-নরওয়ে। হার্ড রক স্টেডিয়ামে খেলা শুরু রাত ৩টায়। এ ম্যাচে বিশেষ নজর থাকবে হ্যারি কেইন-আরলিং হালান্দ দ্বৈরথে।
ইংল্যান্ড অভিযানে ভাইকিংদের নেতৃত্বে ছিলেন হারাল্ড হার্দরাদা। ইতিহাসে হার্দরাদাকে দেখা হয় হিংস্রতার প্রতীক হিসেবে। আরলিং হালান্দের চরিত্র তার উল্টো। তিনি শান্ত স্বভাবের এক নিখুঁত শিকারি। বিশ্বকাপে নিজের প্রতিটি ম্যাচেই গোল পেয়েছেন হালান্দ। চার ম্যাচে ৭ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসি-এমবাপ্পেদের সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। সবশেষ ব্রাজিলের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে তার জোড়া গোলেই ইতিহাস গড়া জয় কুড়ায় নরওয়ে। কোচ স্টালে সোলবাকেন হালান্দকে বিশেষায়িত করেছেন এভাবে, ‘সে মাঠে ও মাঠের বাইরে একজন অসাধারণ নেতা। অনূর্ধ্ব-১৬, ১৭, ১৮ পর্যায় থেকেই এই ছেলেদের সঙ্গে খেলছে। তারা সবাই এই যাত্রাটা দারুণ উপভোগ করছে।’
অন্যদিকে, ভাইকিং আগ্রাসন ঠেকাতে ইংল্যান্ডের রয়েছে হ্যারি কেইনের মতো দক্ষ সেনাপতি। পাঁচ ম্যাচে ৬ গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট রেসে আছেন তিনিও। শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে জয়ে একটি করে গোল ও অ্যাসিস্টে অবদান রাখেন কেইন। বিগ ম্যাচে কেইনের সঙ্গে জুড বেলিংহামের জ্বলে ওঠা ইংলিশদের মনোবল দৃঢ় করেছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে দুই মিনিটের ব্যবধানে দুই গোল করে ম্যাচের গতিপথই পাল্টে দেন বেলিংহাম। হন ম্যাচসেরাও।
প্রিমিয়ার লীগে খেলার সুবাদে ইংল্যান্ডের অনেক ফুটবলারই হালান্দ-ওডেগার্ডদের চেনা প্রতিপক্ষ। তাই বলে এটাকে বাড়তি সুবিধা মানতে নারাজ নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন। তিনি বলেন, ‘এটা (প্রিমিয়ার লীগে খেলোয়াড় থাকা) আমাদের জন্য সুবিধাজনক কি না, জানি না। আমাদের কয়েকজন খেলোয়াড় অবশ্যই অনেক ইংলিশ ফুটবলারের বিপক্ষে খেলেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের সেরা দুই খেলোয়াড় (জুড বেলিংহাম ও হ্যারি কেইন) কিন্তু প্রিমিয়ার লীগে খেলেন না। তারা খেলছেন স্পেন ও জার্মানিতে। তাই বিষয়টি সেভাবেও দেখা যায়।’
ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়েও অবশ্য সতর্ক নরওয়ে। ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে কোচ সোলবাকেনের হিসেবি উত্তর, ‘ব্রাজিলকে হারানো অবশ্যই আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ম্যাচই নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। আগের ম্যাচের ফল এই ম্যাচে কোনো প্রভাব ফেলে না। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত কোনো দলই আমাদের হালকাভাবে নেয়নি। সবাই অনেক বিশ্লেষণ করে। এই ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হবে না।’
অতীত নিয়ে ভাবছে না ইংল্যান্ড শিবিরও। মিডফিল্ডার মর্গান রজার্স বলেন, ‘ওই গল্প শেষ। সামনে আরও বড় ম্যাচ অপেক্ষা করছে। আমরা আরও স্মৃতি তৈরি করতে চাই। কারণ, আমাদের অনেকের কাছে এটাই এ যাবতকালের সেরা ম্যাচ।’
তবে ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেলের চিন্তা বেড়েছে। কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে চোটের কবলে পড়েছে ইংল্যান্ড দল। মেক্সিকোর বিপক্ষে জয় উদযাপনের সময় বাম হাতের হাড় ভেঙে যায় জর্ডান হেন্ডারসনের। টুর্নামেন্টের বাকি সময় বিশ্রামেই থাকতে হবে তাকে। ডেক্লান রাইস বুধবারের অনুশীলন মিস করেছেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনজুরি থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠেননি এই মিডফিল্ডার। পেশিতে টান পড়ায় অনুশীলন মিস করেন মার্ক গেহিও। যদিও সংবাদসূত্রে জানা গেছে, ম্যাচের আগেই সুস্থ হয়ে উঠবেন এই সেন্টারব্যাক। তবে রিস জেমসকে নিয়ে অনশ্চিয়তা কাটেনি। নরওয়ে শিবিরে বড় কোনো চোট নেই। মূল খেলোয়াড়রা সবই সুস্থ আছেন বলেই নিশ্চিত করেছেন কোচ সোলবাকেন। হেড টু হেড রেকর্ডে অবশ্য বেশ এগিয়ে ইংল্যান্ড। ১২ ম্যাচের ৭টিতেই জয়। নরওয়ের জয় দুটি। তবে মাঠের লড়াইকে ইতিহাস দিয়ে মাপা যায় নাÑ কথাটার প্রমাণ চলতি আসরেই মিলেছে বহুবার।
