চট্টগ্রামের ‘গুয়াংজু বাজার’ চীনা পণ্যের বৃহৎ পাইকারি কেন্দ্র

চট্টগ্রামের ‘গুয়াংজু বাজার’ চীনা পণ্যের বৃহৎ পাইকারি কেন্দ্র

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী রেয়াজুদ্দিন বাজার বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ চীনা পণ্যের পাইকারি সরবরাহ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এটি এখন ‘চট্টগ্রামের গুয়াংজু বাজার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চীনের বিভিন্ন শিল্প শহর থেকে সরাসরি এবং স্থানীয় আমদানিকারকদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য আসছে এই বাজারে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রবন্দরের সুবিধার কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজারে চীনা পণ্যের এই ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, চীনের গুয়াংজু, ইইউ ও শেনজেন শহর থেকে সরাসরি বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেন এখানকার অনেক ব্যবসায়ী। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য রেয়াজুদ্দিন বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেয়াজুদ্দিন বাজারে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তিপণ্য। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল ফোনের অ্যাক্সেসরিজ, চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ব্লুটুথ স্পিকার, হেডফোন, স্মার্টওয়াচ, এলইডি লাইট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তাসামগ্রী। এ ছাড়া গৃহস্থালি ও ক্রোকারিজ পণ্যেরও বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। চায়না ক্রোকারিজ, ডিনার সেট, কাঁচ ও সিরামিক পণ্য, রান্নাঘরের আধুনিক সরঞ্জাম, থার্মোস, ফ্লাস্ক এবং বিভিন্ন ধরনের স্টোরেজ সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বাজারটিতে। শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতের জন্যও রেয়াজুদ্দিন বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন ধরনের হার্ডওয়্যার পণ্য, ছোট যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত নানা উপকরণ সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়। পাশাপাশি ঈদ, পূজা ও অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে মৌসুমি সাজসজ্জার পণ্য, উপহারসামগ্রী, শিশুদের খেলনা, স্টেশনারি এবং স্বল্পমূল্যের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের বড় সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত এই বাজার।

রেয়াজুদ্দিন বাজার বণিক সমিতির তথ্যমতে, এই এলাকায় প্রায় ২০০টিরও বেশি মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। এসব মার্কেটে আনুমানিক ১০ হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ীর সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার এবং কর্মরত কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। যদিও এ বিষয়ে সরকারি কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই, তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে রেয়াজুদ্দিন বাজারে প্রতিদিন কয়েকশ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
সেই হিসাবে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবের মৌসুমে এই লেনদেনের পরিমাণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। কাপড়, ইলেকট্রনিক্স, প্রসাধনী, আমদানিকৃত পণ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রী- বিশেষ করে চীনা পণ্যের বৃহৎ পাইকারি কেন্দ্র হিসেবে রেয়াজুদ্দিন বাজারকে অনেকেই চট্টগ্রামের ‘পাইকারি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র’ বলে অভিহিত করেন।

এখান থেকে চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজার, কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পণ্য সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নৈকট্য এবং চীনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজারে চীনা পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদা উভয়ই ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক হাব হিসেবে রেয়াজুদ্দিন বাজারের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তামাকুন্ডি লাইন বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক বলেন, রেয়াজুদ্দিন বাজার এখন শুধু চট্টগ্রামের নয়, সারা দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাণিজ্যকেন্দ্র।
বিশেষ করে চীনা পণ্যের ক্ষেত্রে এই বাজারের ওপর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অসংখ্য ব্যবসায়ী নির্ভরশীল। চীনের বিভিন্ন শহর থেকে সরাসরি এবং আমদানিকারকদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য আসছে বাজারে।

তিনি আরও বলেন, ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল অ্যাক্সেসরিজ, ক্রোকারিজ, গৃহস্থালি সামগ্রী, খেলনা ও প্রসাধনী থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার প্রয়োজনীয় নানা ধরনের পণ্য এক জায়গায় পাওয়া যায় বলেই রেয়াজুদ্দিন বাজারকে অনেকে ‘চট্টগ্রামের গুয়াংজু বাজার’ বলে থাকেন। চট্টগ্রাম বন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হয়, যা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সুবিধা। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এখানে ২০০টির বেশি মার্কেটে ১০ হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্যের লেনদেন হয় এবং উৎসব মৌসুমে এই বাণিজ্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ব্যবসার পরিধি ও পণ্যের বৈচিত্র্যের কারণে রেয়াজুদ্দিন বাজার দেশের অর্থনীতিতে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন