এই ফ্রান্সই কি সর্বকালের সেরা!

এই ফ্রান্সই কি সর্বকালের সেরা!

ফন্ট সাইজ:

বোস্টন থেকে ফেরার পথে দিদিয়ের দেশমের মুখে হাসি চওড়া হওয়ারই কথা। মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফ্রান্স যে শুধু বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেই পা রাখেনি, একইসঙ্গে লিখে ফেলেছে অনেক ইতিহাস। বৃহস্পতিবার রাতে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমার্ধ জুড়ে দাপট দেখিয়েও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ফ্রান্স। উল্টো ২৫তম মিনিটে পাওয়া পেনাল্টি থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পের নেয়া শট রুখে দেন মরক্কো গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনু । কিন্তু বিরতির পর আর দাঁড়াতেই পারেনি আফ্রিকান দলটি। ৬০তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে অসাধারণ এক বাঁকানো শটে গোল করেন এমবাপ্পে নিজেই। আর ছয় মিনিট পর তার বাড়ানো বলে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে। এতে টানা তৃতীয় ও সবমিলিয়ে অষ্টমবার সেমিফাইনালে জায়গা করে নিলো ফ্রান্স।

১৯৯৮ ও ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে, দেশমের বিদায়ী আসরে গড়া এই দলটাই কি তার সেরা সৃষ্টি? ৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের সদস্য প্যাট্রিক ভিয়েরার মতে বিশ্বকাপ জিতলে এই দাবি প্রমাণ করতে পারবে লে ব্লুজরা। প্যাট্রিক ভিয়েরা আইটিভি স্পোর্টকে বলেন, ‘আমরা এক প্রজন্মসেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে কথা বলছি। আপনি যখন এই দল এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের দিকে তাকাবেন, তখন মনে হবে এটি হয়তো অন্যতম সেরা দল; কারণ আপনার হাতে এত বেশি প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে- যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’

আসলে অবিশ্বাস্য না বলে উপায় নেই। এমবাপ্পে-দেম্বেলে ছাড়াও মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, দেজিরে দুয়ে, রেয়ান শেরকি, জঁ-ফিলিপ মাতেতার মতো পরীক্ষিত নাম ফ্রান্সের আক্রমণভাগে থাকায় গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কম প্রতিপক্ষের।
কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আগে পর্যন্ত মরক্কো ছিল এই বিশ্বকাপের অন্যতম চমক। রক্ষণ জমাট, পাল্টা আক্রমণে ধারালো। কিন্তু ফ্রান্সের বিপক্ষে বল দখলে পিছিয়ে পড়ে সেই দল নিজের ছায়া হয়ে রইলো। প্রতিপক্ষের ওপর কার্যত কোনো ছাপই ফেলতে পারেনি মরক্কো। পরিসংখ্যান সেই ব্যর্থতার প্রতিটি দিক স্পষ্ট করে দিচ্ছে। পুরো ম্যাচে ফ্রান্স নিয়েছে ২২টি শট, যেখানে মরক্কোর সংখ্যা মোটে পাঁচ। এই পাঁচটির মধ্যে লক্ষ্যে ছিল কেবল একটি শট। সেটিও এসেছে ম্যাচের ৮৩তম মিনিটে। যখন ফলাফল প্রায় নির্ধারণ হয়ে গেছে। পুরো ম্যাচে একবারের জন্যও ফরাসি গোলরক্ষককে সত্যিকারের পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি হাকিমি- এল আইনাউইরা।

মিশরের বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেও জয়ের নায়ক হন লিওনেল মেসি। এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে তোলেন কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে। মেসির পর একই কাণ্ড ঘটালেন এমবাপ্পে। বিশ্বকাপে গত ৬০ বছরে এক ম্যাচে পেনাল্টি মিস করে গোল ও অ্যাসিস্ট দুটোই করার ঘটনা ঘটেছে মাত্র চারবার। তার দু’টিই এই সপ্তাহে। এই গোলে ৮ গোল নিয়ে মেসির সমান হয়ে গেলেন এমবাপ্পে। আর ছুঁয়ে ফেলেন ২০ বিশ্বকাপ গোলের মাইলফলক। বেশি অ্যাসিস্ট থাকায় গোল্ডেন বুটের দৌড়ে অবশ্য এখন এগিয়ে ফরাসি তারকা। টানা দুই বিশ্বকাপে ১০ বা তার বেশি গোলে অবদান রাখা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি। ২০২২ সালে ৮ গোল ২ অ্যাসিস্ট, আর এবার ৮ গোল ৩ অ্যাসিস্ট। ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর এক আসরে এমন অবদানও আর কারও নেই।

শুধু এমবাপ্পে নন, ৫ গোল নিয়ে দেম্বেলেও কম যাচ্ছেন না। গত ৫০ বছরে ফ্রান্সই দ্বিতীয় দল, যাদের একই বিশ্বকাপে দুই খেলোয়াড় পাঁচ বা তার বেশি গোল করেছেন। এর আগে ২০০২ সালে ব্রাজিলের হয়ে এই কীর্তি গড়েছিলেন রোনালদো (৮) ও রিভালদো (৫)। মরক্কোর বিপক্ষে জয়টি দেশমের কোচিং ক্যারিয়ারেও বিশেষ কিছু। বিশ্বকাপের মূল পর্বে ২০ জয় পাওয়া প্রথম কোচ তিনি। আর ম্যাচসংখ্যায় (২৫) ছুঁয়ে ফেলেছেন জার্মান কিংবদন্তি হেলমুট শনের রেকর্ড। ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ ছিল মরক্কো। সেবারও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরেছিল তারা। থিও এরনান্দেজ ও র‌্যান্ডাল কোলো মুয়ানির গোলে জিতেছিল ফ্রান্স। ২০২২ সালের সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তি ঘটলো এবারের কোয়ার্টার ফাইনালে। দুইবারই জয়ী দল ফ্রান্স, দুইবারই ব্যবধান ২-০।

স্পেন-বেলজিয়াম কোয়ার্টার ফাইনালের বিজয়ীর বিপক্ষে সেমিফাইনালে খেলবে ফ্রান্স। এখন পর্যন্ত সেনেগাল, ইরাক, নরওয়ে, সুইডেন, প্যারাগুয়ে ও মরক্কোকে হারিয়ে তারা অপরাজিত। শিরোপা থেকে মাত্র দুই ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে দেশমের শেষ নৃত্য যদি জয় দিয়েই শেষ হয়, তবে ইতিহাসে নিজের নামটা আরেকবার সোনালি অক্ষরে লেখাবেন এই ফরাসি কোচ।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন