পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে একটু থামা, এরপর সামান্য এগিয়ে যাওয়া। তারপরে শট। বিশেষ এই কৌশল পরিচিত ‘প্যারাদিনহা’ নামে। পর্তুগিজ ভাষায় এর অর্থ ‘ছোট্ট একটু থামা। এবারের বিশ্বকাপে এই কৌশলে পেনাল্টি কিক নেন লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানোর রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, হ্যারি কেইন ও নেইমার জুনিয়র। তাদের কেউ সফল আবার কেউ ব্যর্থ হয়েছেন।
‘প্যারাদিনহা’ কৌশলের সূচনা ব্রাজিলে। ১৯৫০-৬০ এর দশকে পেনাল্টি নিতে দৌড়ে এসে হঠাৎ থামা বা ছন্দ বদলে গোলরক্ষককে বিভ্রান্ত করার কাজটি প্রথম জনপ্রিয় করেন কিংবদন্তি পেলে। সেই ধারা এগিয়ে নিয়ে যান স্বদেশি নেইমার। ২০১০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে সান্তোস ক্লাবের হয়ে পেনাল্টি নিতে গিয়ে এতটাই ধীরে এগিয়েছিলেন যে, দাঁড়িয়ে পড়েন বলের পাশে। গোলরক্ষক আগেই ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপর সহজে বল জালে পাঠান নেইমার। এই কাণ্ড দেখে ফুটবলের আইন প্রণেতারা নড়েচড়ে বসেন। নিয়ম পরিবর্তন হলো। দৌড় শেষে বল মারার ঠিক আগে থামলে হলুদ কার্ড ও গোল বাতিল। তবে দৌড়ের মধ্যে ছন্দ বদলানো এখনও বৈধ।
এই বিশ্বকাপে ‘প্যারাদিনহা’ কৌশলের সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোর মুখই দেখেছে। শেষ ষোলোয় প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কিলিয়ান এমবাপ্পে এই কৌশলে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে একই কৌশলে সফল হন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। নরওয়ের বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচে ‘প্যারাদিনহা’ কৌশলে শেষ গোলটি করেন নেইমার। পেনাল্টি থেকে হতাশ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ‘প্যারাদিনহা’ কৌশল ব্যবহার করে পোস্টের বাইরে বল মেরেছিলেন মেসি। মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোয় স্বাভাবিক দৌড়ে পেনাল্টি নিলেও গোলরক্ষক রুখে দেন। ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ‘প্যারাদিনহা’ কৌশল ব্যবহার করে পেনাল্টি মিস করেন। তবে গোলরক্ষক লাইন ছাড়ায় রিটেক পান। পরে গোল করেন। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মুহূর্তের সাক্ষীও এই কৌশল। নরওয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের ব্রুনো গিমারেস ‘প্যারাদিনহা’ কৌশলে পেনাল্টি নিয়ে ব্যর্থ হন। সেই মিসই ব্রাজিলের বিদায়ের অন্যতম কারণ। মরক্কোর বিপক্ষে শুটআউটে নেদারল্যান্ডসের জাস্টিন ক্লুইভার্ট ‘প্যারাদিনহা’ কৌশলে শট নিয়ে বল পোস্টে লাগান।
নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্ট সায়েন্সেসের অধ্যাপক এবং ‘প্রেশার: লেসনস ফ্রম দ্য সাইকোলজি অব দ্য পেনাল্টি শুটআউট’ বইয়ের লেখক গেইর ইয়োর্ডেট বলেন, ‘এটি অত্যন্ত জটিল একটি কৌশল এবং চাপের মুহূর্তে এটি প্রয়োগ করা সত্যিই কঠিন। যদি আপনি এই কৌশলে দক্ষ হন, তবে গোলরক্ষক বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঝুঁকি আর থাকে না এবং আপনার গোল করার সম্ভাবনা কমে যাওয়ার ভয়ও থাকে না। তবে এই কৌশল ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে মাথায় অত্যন্ত স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার।’ পেনাল্টিতে ‘প্যারাদিনহা’ কৌশলে সবচেয়ে সফল মেক্সিকোর স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেজ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-২ হারের ম্যাচে এই কৌশলে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লীগের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা পেনাল্টি টেকার হিমেনেজ। ১৪ কিকে ১৪ গোল। সাফল্যের হার শতভাগ। তবে এই কৌশল এখন আর একতরফা সুবিধা দিচ্ছে না। গোলরক্ষকরা এই কৌশলকে রুখে দেয়ার মন্ত্র জেনে গেছেন। ইয়োর্ডেট বলেন, ‘গোলরক্ষকরাও এখন অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন। তারা নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছেন। আগেভাগে ঝাঁপিয়ে না পড়ে দেরি করে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। শুটারকে চাপে ফেলার জন্য এখন তারা আরও বেশি সৃজনশীল এবং কৌশলী।’
