ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ কি এটাই

রেকর্ড গড়া গোল, রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তন ও অঘটন

ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ কি এটাই

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল মহোৎসবের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্ব শুরু হয়ে গেছে। টুর্নামেন্টের বাকি মাত্র ৭টি ম্যাচ। ইতিহাসের প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ নিয়ে এবং যৌথভাবে তিনটি দেশে (কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র) আয়োজিত এই বিশ্বকাপ যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে মাঠের লড়াই, উত্তেজনা ও নাটকীয়তায় এটিই কি ইতিহাসের ‘সেরা বিশ্বকাপ’? বিশ্লেষণ করেছে বিবিসি।

গোলবন্যা ও আক্রমণাত্মক ফুটবল
একটি আকর্ষণীয় বিশ্বকাপের প্রধান শর্তই হলো প্রচুর গোল। এবারের আসরের ৯৬টি ম্যাচে গোল হয়েছে মোট ২৮০টি। ম্যাচপ্রতি গোলের গড় ২.৯২, যা ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের (ম্যাচপ্রতি ২.৯৭ গোল) পর সর্বোচ্চ। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গড় গোল ছিল ২.৬৯ এবং ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ছিল ২.৬৭। এবার আক্রমণাত্মক ফুটবলের আরেকটি বড় প্রমাণ হলো, মোট গোলের ৭৪.৬% এসেছে ওপেন প্লে থেকে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ। বিপরীতে পেনাল্টি থেকে গোল এসেছে মাত্র ৫%; যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। জার্মানির কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেয়া ম্যাচটি সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়লেও, আরও সাতটি ম্যাচে ৬টি করে এবং ১৩টি ম্যাচে ৫টি করে গোল দেখেছে দর্শকরা।

শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা ও রেকর্ড ড্র
নকআউট পর্বের ২৪টি ম্যাচের মধ্যে ৮টিতেই ৮৫ মিনিটের পর জয়সূচক গোল এসেছে। মিশরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজের করা জয়সূচক গোলটি ছিল এই টুর্নামেন্টের দশম ৯০তম মিনিটের গোল, যা ইতিমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ রেকর্ড। কেবল জুলাই মাসেই ফুটবলপ্রেমীরা তিনটি ধ্রুপদী ম্যাচ উপহার পেয়েছেন। যেখানে বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড যথাক্রমে সেনেগাল, মিশর ও মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে রোমাঞ্চকর জয় তুলে নিয়েছে। বেলজিয়াম এবং আর্জেন্টিনা দুই দলই ম্যাচের শেষ দিকে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ জিতেছে। ১৯৭০ সালের পর একই টুর্নামেন্টে একাধিকবার এমন প্রত্যাবর্তনের নজির আর নেই। অন্যদিকে, মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী আজতেকা স্টেডিয়ামে জ্যারেল কোয়ানসার লাল কার্ডের কারণে ৪০ মিনিট ১০ জন নিয়ে খেলেও, মেক্সিকোকে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। তবে এবারের আসরে রেকর্ডসংখ্যক ৮টি গোলশূন্য ড্র-ও দেখা গেছে।

ভরা গ্যালারি ও মহাতারকাদের উৎসব
টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য এবং হাজার হাজার মাইল ভ্রমণের ধকলের কারণে গ্যালারি ফাঁকা থাকার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ফিফার তথ্যমতে, স্টেডিয়ামগুলোর ৯৯.৭% আসনই পূর্ণ ছিল। গ্রুপ পর্বেই ৪৪ লাখের বেশি দর্শক মাঠে এসেছিলেন, যা নকআউট পর্ব শেষে দাঁড়িয়েছে ৬২ লাখে। ম্যাচপ্রতি গড় দর্শক উপস্থিতি ৬৫,০০০-এর বেশি, যা কেবল ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপের (৬৯,০০০) চেয়ে পিছিয়ে।

মাঠে দর্শকদের পাশাপাশি আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্বসেরা তারকারাও। গোল্ডেন বুটের দৌড় এবার রূপ নিয়েছে ইতিহাসের অন্যতম সেরা লড়াইয়ে। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ৮ গোল নিয়ে শীর্ষে আছেন। ৭ গোল নিয়ে তাকে তাড়া করছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের আর্লিং হালান্দ। হ্যারি কেইন করেছেন ৬ গোল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এবারই প্রথম একই টুর্নামেন্টে তিনজন খেলোয়াড় ৭ বা তার বেশি গোল করলেন।
আন্ডারডগদের রূপকথা
দল সংখ্যা ৪৮-এ উন্নীত করায় একপেশে ম্যাচের যে ভয় ছিল, তা উড়িয়ে দিয়েছে ছোট দলগুলো। বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট দেশ কুরাসাও জার্মানির কাছে ১-৭ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইকুয়েডরের সঙ্গে ড্র করে ঘুরে দাঁড়ায়। কাতার কানাডার কাছে ৬-০ গোলে হারলেও, কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ ড্রয়ে চমকে দেয়। সবচেয়ে বড় রূপকথা লিখেছে কেপ ভার্দে। ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিনিয়ার হাত ধরে তারা স্পেন, উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে শেষ ৩২-এ জায়গা করে নেয়। সেখানে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা।

বিতর্ক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কালো ছায়া
অসংখ্য ইতিবাচক দিকের মাঝেও এই বিশ্বকাপ বড় কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। টিকিট ও হোটেলের মাত্রাতিরিক্ত খরচ ভক্তদের পকেটে বড় টান ফেলেছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে হাইড্রেশন ব্রেক মেনে নেয়া হলেও, বৃষ্টি বা এসি স্টেডিয়ামে ছাদ বন্ধ থাকা অবস্থায় এই ব্রেক দেয়ায় দর্শকরা দুয়ো দিয়েছেন। এছাড়া, টুর্নামেন্টের দীর্ঘ সময়সীমা (১১ই জুন থেকে ১৯শে জুলাই) এবং ফুটবলারদের ক্লান্তির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। কেননা, বিশ্বকাপ শেষের মাত্র এক মাস দুই দিন পর (২১শে আগস্ট) শুরু হচ্ছে প্রিমিয়ার লীগ।

তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ফেয়ার প্লে-র চেতনা নিয়ে। শেষ ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান লাল কার্ড দেখে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করার পর ফিফা তাদের শৃঙ্খলা বিধির বিশেষ ধারা (আর্টিকেল ২৭) ব্যবহার করে বালোগানের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। ফলে শেষ ১৬-তে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তিনি মাঠে নামতে পারেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১৮৯টি লাল কার্ডের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর এমন ঘটনা ১৯৬২ সালের পর এই প্রথম।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন