কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কমলাপুর এলাকায় দীর্ঘদিনের জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রবাসী ও সাধারণ মানুষকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি দায়ের হওয়া একটি হামলা মামলাকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন মামলার অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যরা। তারা প্রশাসনের কাছে ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
৭ জুলাই (মঙ্গলবার) বিকেলে কমলাপুর এলাকায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তারা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্তভাবে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানান।
অভিযুক্ত পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় আওয়ামী লীগের ২৭ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মাস্টার নুর আহমেদের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রতিপক্ষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের দাবি, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং একাধিক মামলায় জড়িয়ে হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মাস্টার নুর আহমেদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, মাস্টার নুর আহমেদের ছেলে রাসেল এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছেন। এছাড়া যুবলীগ নেতা মোসলেম ও নুরুল ইসলাম এবং ছাত্রলীগ নেতা তপু, রায়হান ও অমির বিরুদ্ধেও এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবারটির দাবি, প্রাণনাশের হুমকি ও হয়রানির অভিযোগে রাশেদা বেগম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পর উল্টো তার ছেলে রেজাউল করিম রিফাতসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে পরিকল্পিতভাবে একটি হামলা মামলায় আসামি করা হয়।
মামলায় অভিযুক্ত রেজাউল করিম রিফাত (২০), নজির আহমেদ মজুমদার (৫৫), রিপন মজুমদার (৪৫) ও রিয়াদ (২৩)-এর পরিবার জানায়, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং আইনি হয়রানির উদ্দেশ্যেই এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, মামলায় হামলা, হত্যাচেষ্টা ও শ্লীলতাহানির মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হলেও বাস্তব ঘটনার সঙ্গে এসব অভিযোগের মিল নেই।
এদিকে দুবাইপ্রবাসী রিপন মজুমদার অভিযোগ করে বলেন, গত কয়েকদিন আগে রাত সাড়ে আটটার দিকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে মুখোশ পরিহিত চার ব্যক্তি তার গতিরোধ করেন। তিনি দাবি করেন, হামলাকারীদের মধ্যে স্থানীয় যুবলীগ নেতা রাসেল, তপু, রায়হান ও অমি ছিলেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি তাদের চিনতে পারেন বলে দাবি করেন। তার অভিযোগ, হামলাকারীরা তার মোবাইল ফোন, বিদেশে অবস্থানের ১১টি ভিসা-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এবং গলায় থাকা একটি স্বর্ণের চেইন জোরপূর্বক নিয়ে যায়।
রিপন মজুমদার আরও বলেন, পরদিন সকালে বিষয়টি এলাকাবাসীকে জানালে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে উল্টো তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
রিপন মজুমদার বলেন, “আগের দিন ডাকাতের বেশে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। পরদিন উল্টো আমাকে ও আমার পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। অথচ এ ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।”
অভিযুক্ত পরিবারের দাবি, উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং একাধিক দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। সেই বিরোধের জের ধরেই বর্তমান ফৌজদারি মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাসির মিয়া, মফিজ, ছিদ্দিক মজুমদার, জলিল ও আনোয়ার হোসেন মজুমদার—মনে করেন, প্রকৃত ঘটনা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসা উচিত। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী বা নির্দোষ হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর দক্ষিণ মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহবুব বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযুক্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্তভাবে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা হোক।
