হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের সামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ দিন আগে চালানো হামলার তুলনায় এবারের অভিযান চার থেকে পাঁচ গুণ বড়। এতে ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের নতুন হামলার জবাবে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এটি আরও কয়েক ঘণ্টা চলতে পারে। এমন সময় এই হামলা চালানো হলো, যখন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও শোক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।
এর আগে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার পর ইরানি তেলের ওপর দেয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা-ছাড় প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসান নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনার মধ্যেই তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরানের বিরুদ্ধে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা। এতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং তিন সপ্তাহেরও কম আগে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বন্দর স্থাপনা এবং ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু ছিল। ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, সিরিক এবং কেশম দ্বীপে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আল জাজিরা জানিয়েছে, কেশম দ্বীপে অন্তত ছয় দফা, সিরিকে সাত থেকে নয় দফা এবং বন্দর আব্বাসে অন্তত ১০ দফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এপি’কে বলেছেন, জুনের শেষ দিকে চালানো প্রতিশোধমূলক হামলার তুলনায় এবার প্রায় আট গুণ বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করা হয়। তার ভাষায়, ইরান কোনো কথা শুনছে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র এবার আওয়াজ আরও বাড়াচ্ছে। আরেক কর্মকর্তা সিএনএন’কে বলেন, হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার শাস্তি দিতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে থাকা ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) ৬০টিরও বেশি ছোট নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা কমে যায়।
অ্যাক্সিওসকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্ক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই হামলার পরিকল্পনায় অনুমোদন দেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নিরীহ জাহাজে ইরানের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সরাসরি জবাব এটি। নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি ইরান জানত, তবুও তারা হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে, প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা স্থগিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর এই হামলাকে নির্লজ্জ আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছে। তাদের অভিযোগ, ইরাকে খামেনির মৃতদেহ নিয়ে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা চলার সময়ই এই হামলা চালানো হয়েছে। এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়া জবাব দেয়া হবে। তারা আরও বলেছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা মেনে নেবে না। তাদের বক্তব্য, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের নিরাপদ চলাচলের একমাত্র পথ হলো ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান নির্ধারিত রুট। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ইরান কোনো চাপের কাছে মাথা নত করবে না।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমওইউর বড় ধরনের লঙ্ঘন করেছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, নতুন হামলার হুমকি, তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল, দক্ষিণ ইরানে হামলা এবং লেবাননে জায়নবাদী আগ্রাসন অব্যাহত রাখা- এসবই তার প্রমাণ। ভয় দেখিয়ে বা চাপ সৃষ্টি করে কিছুই অর্জন করা যাবে না। আমরা নতি স্বীকার করব না। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের শামিল। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই অঙ্গীকার ভঙ্গের সব পরিণতির দায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারকেই বহন করতে হবে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগকে সন্দেহজনক বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। তবে বৃটেনের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে, ওমান উপকূলের কাছে একটি ট্যাংকারে হামলার পর সেটিতে আগুন ধরে যায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, সতর্কবার্তা অমান্য করায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজটি হামলার মুখে পড়ে। তবে হামলার দায় সরাসরি স্বীকার করেনি তেহরান। বাকি দুটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ হতাহত হননি এবং সেগুলো যাত্রা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছে বৃটেনের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার তিনটি ঘটনাই ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছে ঘটেছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজগুলো ওমান উপকূলঘেঁষা রুট ব্যবহার করছিল। শান্তিকালে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।
এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরাকের নাজাফে খামেনির শোক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর তিনি দ্রুত তেহরানে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি। প্রেস টিভি জানিয়েছে, পেজেশকিয়ানের ইরাকি কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করারও পরিকল্পনা ছিল। খামেনি এবং তার পরিবারের তিন সদস্যের মৃতদেহ নাজাফে নেয়া হয়েছে। সেখান থেকে কারবালায় নেয়ার পর ৯ জুলাই ইরানের মাশহাদ শহরে তাদের দাফন করা হবে। এদিকে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এখনও শোকের কোনো আনুষ্ঠানিকতায় প্রকাশ্যে অংশ নেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার বাবাকে হত্যার যে বিমান হামলা হয়েছিল, তাতে তিনি আহত হন এবং বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।
