ফুল-টাইম: আর্জেন্টিনা ৩-২ মিশর
শেষ বাঁশি বাজালো রেফারি! বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা এক অঘটন ঘটিয়েই ফেলেছিল মিশর। কিন্তু তার বদলে ফুটবল বিশ্ব দেখলো আর্জেন্টিনার মহাকাব্যিক এক প্রত্যাবর্তন। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই প্রথম দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচ জিতলো আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লিওনেল মেসি। তবে এ কান্না বিষাদের নয়, আনন্দের। প্রথমার্ধে পেনাল্টি মিস করে যে চাপ তিনি তৈরি করেছিলেন, দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে এক অ্যাসিস্ট আর এক গোল করে দলকে সমতায় ফিরিয়ে নিজেই তার প্রায়শ্চিত্ত করলেন। আর্জেন্টিনা শিবির এখন স্বস্তি আর উল্লাসে ভাসছে। টানা দ্বিতীয় এবং চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এখনো টিকে রইল তাদের।
অন্যদিকে রেফারির শেষ বাঁশির পর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন মোহাম্মদ সালাহ ও তার দল। পুরো ম্যাচে বীরের মতো লড়াই করেও এমন হার মেনে নেয়া কঠিন। তবে মিশর আজ ম্যাচ হারলেও মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছে, কারণ তারা কোনো ভুল করেনি। তারা স্রেফ হেরে গেছে এক অতিমানবীয় ফুটবল জাদুকরের পায়ের কাছে।
এর আগে যোগ করা সময়ে গোল খেয়ে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কায় মেজাজ হারায় মিশরীয় শিবির। আর্জেন্টিনার কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল হওয়ার ঠিক আগে নিজেদের বক্সে ম্যাক অ্যালিস্টার মিশরের ফাতিকে টেনে ফেলে দিয়েছিলেন বলে দাবি করে তারা। এই নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করায় গোলকিপার শোবের হলুদ কার্ড দেখেন এবং মিশরের একজন স্টাফ মাঠের ভেতর ঢুকে লাল কার্ড পান। পরে প্রতিবাদ করায় ফাতি এবং ম্যাক অ্যালিস্টারকে ফাউল করায় আতিয়াও হলুদ কার্ড দেখেন। ক্ষোভে ফেটে পড়া মিশরের কোচ হোসাম হাসানও রেফারিকে কিছু বলায় হলুদ কার্ডের তালিকায় নাম লেখান। শেষ মুহূর্তে বদলি হিসেবে ওতামেন্দি ও মেদিনা মাঠে নামেন এবং লাউতারো মার্টিনেজ কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে বল ধরে রেখে সময় নষ্ট করতে গিয়ে আতিয়ার সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান।
৯০+২ মিনিট: আর্জেন্টিনা ৩-২ মিশর
গোল! অবিশ্বাস্য এক নাটকীয়তায় লিড নিলো আর্জেন্টিনা! ডান প্রান্ত থেকে আরও একটি চমৎকার ক্রস ভেসে আসে মিশরের বক্সে। সেখানে লাফিয়ে উঠে এনজো ফার্নান্দেজ নিখুঁত এক হেডে বল পাঠিয়ে দেন পোস্টের ডান দিকের উপরের কোণায়। গোলকিপার শোবেরের সাধ্য ছিল না এটি আটকানোর। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও যোগ করা সময়ে দুর্দান্ত এই গোল করে অবিশ্বাস্য এক প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ করল আলবিসেলেস্তেরা।
৮৩ মিনিট: আর্জেন্টিনা ২-২ মিশর
গোল! সমতায় ফিরলো আর্জেন্টিনা, লিওনেল মেসি ম্যাজিক! ডান প্রান্ত থেকে মেসির বাড়ানো ক্রসটি মিশরের রক্ষণভাগ ঠিকমতো ক্লিয়ার করতে পারেনি। বাঁ প্রান্ত থেকে বলটি আবার বক্সের ভেতর ফেরত পাঠান লাউতারো মার্টিনেজ। হুলিয়ান আলভারেজ বুক দিয়ে আলতো ছোঁয়ায় বলের গতি কমিয়ে মেসির সামনে বাড়িয়ে দেন। ড্রপ খাওয়া বলটিতে কোনো সময় নষ্ট না করে নিখুঁত এক শটে জালের ঠিকানা খুঁজে নেন মেসি। মিশরীয় গোলকিপারের এবার আর কিছুই করার ছিল না। ৪ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে ম্যাচে দুর্দান্তভাবে ফিরে এলো আলবিসেলেস্তেরা।
৭৯ মিনিট: আর্জেন্টিনা ১-২ মিশর
গোল! রোমেরোর হেডে ব্যবধান কমালো আর্জেন্টিনা। ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত এক ক্রসে বল বক্সে বাড়ান লিওনেল মেসি। সেখানে সম্পূর্ণ অরক্ষিত থাকা ক্রিস্টিয়ান রোমেরো মাত্র ছয় গজ দূর থেকে চমৎকার হেডে বল জালের ডান দিকে পাঠান। মিশরীয় গোলকিপার শোবের ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে হাত ছোঁয়ালেও বলের গতি রুখতে পারেননি। এই গোলের মাধ্যমে ম্যাচে ফেরার দারুণ ইঙ্গিত দিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
৬৭ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-২ মিশর
গোল! এবার আর কোনো ভুল নেই। জিকোর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করলো মিশর! আর্জেন্টিনার একটি কর্নার থেকে বল পেয়েই কাউন্টার অ্যাটাকে গতি বাড়ান মোহাম্মদ সালাহ। ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে কাটিয়ে তিনি ডান প্রান্তে থাকা হাসানকে পাস দেন। হাসান গতিতে নাহুয়েল মলিনাকে পরাস্ত করে একদম বাইলাইনের কাছ থেকে বক্সে চমৎকার কাট-ব্যাক করেন। সেখানে ওত পেতে থাকা জিকো মাত্র ছয় গজ দূর থেকে বুলেট গতির শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। বিশ্বমঞ্চে এবার সত্যিই বড় এক অঘটনের সুবাস দিচ্ছে মিশর।
৫৮ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
গোল বাতিল! ভিএআরের হস্তক্ষেপে বেঁচে গেল আর্জেন্টিনা। পাল্টা আক্রমণ থেকে অসাধারণ এক গোল করে উল্লাসে মেতে উঠেছিল মিশর। তবে গোলটির ঠিক আগের মুহূর্তে, মিশরের নিজেদের অর্ধে আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে জার্সি টেনে ধরে ফাউল করেছিলেন। ভিএআর দেখে রেফারি ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে আর্জেন্টিনার পক্ষে ফ্রি-কিকের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্তটি সঠিক হলেও মিশরের জন্য এটি ছিল চরম এক হৃদয়ভঙ্গ।
হাফটাইম: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
আটলান্টা স্টেডিয়ামে বড়সড় এক অঘটনের আভাস দিয়ে বিরতিতে গেল দুই দল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কোনো ম্যাচ না জেতা মিশরের জন্য এটি স্বপ্নের এক প্রথমার্ধ। অন্যদিকে, তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এক গোলে পিছিয়ে থেকে মাঠ ছাড়লো। আলবিসেলেস্তেরা এখনো প্যানিক না করলেও, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে দ্বিতীয়ার্ধে তাদের কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে গোল শোধের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে নিজেদের বক্সের সামনে মিশরীয় ডিফেন্ডারদের কড়া পাহারায় লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা কেবল অফসাইডই হতে পেরেছেন। অন্যদিকে, গোলকিপার মোস্তফা শোবেরের একের পর এক দুর্দান্ত সেভে মাথায় হাত পড়ে লিওনেল মেসি এবং হুলিয়ান আলভারেজের। গ্যালারিতে থাকা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কোচ দিয়েগো সিমিওনেও আলভারেজের শটটি নিশ্চিত গোল ভেবে বসেছিলেন। কিন্তু শোবেরের বিশ্বমানের সেভ সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। প্রথমার্ধের অতিরিক্ত ৫ মিনিটেও নিজেদের রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা ধরে রাখে মিশর।
৪০ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
বাঁ প্রান্ত দিয়ে তাগলিয়াফিকোকে লক্ষ্য করে একটি লম্বা পাস বাড়ানো হয়। তিনি কোনোমতে পা বাড়িয়ে বলটি বক্সের মাঝখানে দেন হুলিয়ান আলভারেজের উদ্দেশ্যে। আলভারেজ শরীরটা ঘুরিয়ে ডান দিকের নিচের কোণ লক্ষ্য করে জোরালো সাইডফুট শট নেন। একদম ছবির মতো সুন্দর এক গোল হতে পারত এটি। কিন্তু পুরো শরীর বাতাসে ভাসিয়ে এক হাতের দারুণ ছোঁয়ায় বল পোস্টের বাইরে ঠেলে দেন মিশরীয় গোলকিপার শোবের। আরও একবার অসাধারণ এক সেভে আর্জেন্টিনাকে হতাশ করলেন তিনি।
২৯ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
আর্জেন্টিনার আক্রমণের গতি বাড়ল। ডান প্রান্ত থেকে রদ্রিগো ডি পল চমৎকার একটি ক্রস বাড়ান বক্সে। গোলপোস্টের মাত্র ছয় গজ দূর থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার হেড করলেও তা মিশরীয় ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে প্রতিহত হয়। এরপর বক্সের প্রান্ত থেকে এনজো ফার্নান্দেজ ফিরতি বলে জোরালো শট নিলেও সেটিও ব্লক করে দেয় মিশরের রক্ষণভাগ।
২১ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
মেসির পেনাল্টি মিস! পেনাল্টি নেয়ার চিরচেনা আনুষ্ঠানিকতা শেষে মেসি শট নিলেও, তা আটকে দেন মিশরের গোলকিপার শোবের। মেসি পোস্টের ডান দিকের নিচের কোণ লক্ষ্য করে মারলেও শটটিতে পর্যাপ্ত গতি ছিল না। গোলকিপারদের জন্য একদম সুবিধাজনক উচ্চতায় থাকা বলটির দিক আগেই অনুমান করে চমৎকারভাবে ফিরিয়ে দেন শোবের। ফলে পেনাল্টি থেকেও সমতায় ফেরা হলো না আর্জেন্টিনার।
১৫ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-১ মিশর
গোল! ইব্রাহিমের চোখধাঁধানো হেডে এগিয়ে গেল মিশর। ডান প্রান্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে চাপে ফেলে ম্যাচের প্রথম কর্নার আদায় করে নেন হ্যানি। কর্নার থেকে বল ফেরত পেয়ে উইং দিয়ে ভেতরে ক্রস বাড়ান আতিয়া। সেখানে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে অনেকটা নিঃশব্দে বক্সে ঢুকে চমৎকার এক হেডে বল জালে জড়ান ইব্রাহিম। পোস্টের ডান দিকের উপরের কোণ দিয়ে বল জালে জড়ানোর সময় গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজের স্রেফ দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
৭ মিনিট: আর্জেন্টিনা ০-০ মিশর
ডান প্রান্তে দারুণ খেলে একটি ফ্রি-কিক আদায় করে নিলেন মিশরের হাসান। আতিয়া সেই ফ্রি-কিক থেকে বক্সের ভেতর বল বাড়ালেও আর্জেন্টিনার গোলপোস্টের সামনে দিয়ে তা পার হয়ে যায়। সেখানে কোনো মিশরীয় ফুটবলার না থাকায় বেঁচে গেল আলবিসেলেস্তেরা।
কিক অফ
শুরু মাঠের লড়াই
৩ পরিবর্তন আর্জেন্টিনার
বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার হাইভোল্টেজ ম্যাচে আজ আটলান্টায় মুখোমুখি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও মিশর। একদিকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠে প্রথম জয়ের স্বাদ পাওয়া রূপকথার মিশর, অন্যদিকে শিরোপাপ্রত্যাশী আলবিসেলেস্তেরা। দুই ভিন্ন মেজাজের দলের এই দ্বৈরথকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।
মিশরের রক্ষণ ভাঙতে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি শুরুর একাদশে তিনটি বড় পরিবর্তন এনেছেন। পেশির টানের কারণে ফাকুন্দো মেদিনার জায়গায় ইনজুরি কাটিয়ে ফিরছেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকো। মাঝমাঠে ধার বাড়াতে থিয়াগো আলমাদার পরিবর্তে শুরু থেকেই খেলবেন লিয়ান্দ্রো পারেদেস। ফলে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার কিছুটা ওপরে উঠে খেলার স্বাধীনতা পাবেন। আক্রমণভাগেও এসেছে বড় বদল। অফফর্মে থাকা লাওতারো মার্তিনেজের জায়গায় গোড়ালির চোট কাটিয়ে ফিরেই মূল একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন তরুণ হুলিয়ান আলভারেজ।
লিভারপুলের কিংবদন্তি মোহামেদ সালাহ জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো সাফল্য পাচ্ছিলেন না। তবে এবার সালাহর জাদুকরী নেতৃত্বেই ইতিহাস বদলে দিয়েছে ‘ফারাও’রা। বিশ্বকাপে এর আগে কখনো কোনো ম্যাচ না জেতা মিসর এবার শেষ ১৬তে জায়গা করে নিয়েছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটি কঠিন হলেও, জিতলে সালাহর দল পৌঁছে যাবে অনন্য এক উচ্চতায়।
আর্জেন্টিনা একাদশ: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, নাহুয়েল মলিনা, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, রদ্রিগো ডি পল, লিয়ান্দ্রো পারেদেস, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার, লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ।
মিশর একাদশ: মোস্তফা শোবেইব, মোহামেদ হানি, রামি রাবিয়া, ইয়াসির ইব্রাহিম, করিম হাফেজ, ইমাম আশুর, মারোয়ান আতিয়া, মোহামেদ লাশিন, হাসান, মোহামেদ সালাহ, জিকো।
