জীবন অনেক সময় ঘুরে আসে ঠিক সেই জায়গায়, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। মিকেল মেরিনোর জীবনটাও যেন তেমনই এক বৃত্ত। যে বৃত্ত শুরু হয়েছিল তার বাবার হাত ধরে, সেটি সম্পূর্ণ হলো ছেলের নামে। গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে গিয়ে সেই পরিচিত ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ালেন মেরিনো। এই উদ্যাপন তার নিজের আবিষ্কার নয়। ৩৩ বছর আগে স্টুটগার্ডের বিপক্ষে বাবা আনহেল মিগুয়েল ওসাসুনার হয়ে ঠিক এই ভঙ্গিতেই শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল উদ্যাপন করেছিলেন। সেদিনের সেই মুহূর্তটা মেরিনো নিজের চোখে দেখেননি। কিন্তু গল্প হয়ে তা বেঁচে ছিল পরিবারে। বিশ্বকাপে রাউন্ড অব সিক্সটিনে মেরিনোর পায়ে সেই গল্পই যেন নতুন করে জীবন পেলো।
বৃত্তের শুরুটা আরও অদ্ভুত। মেরিনোর জন্ম ২২ জুন ১৯৯৬, পামপ্লোনায়।
সেদিন ইউরোতে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায় স্পেন। হারের দিনে জন্ম নেয়া সেই শিশুই আজ স্পেনকে জিতিয়ে দিলেন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। মেরিনোর শেষ সময়ের গোলে পর্তুগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ আট নিশ্চিত করেছে স্পেন। বৃত্তের নতুন অধ্যায় ছেলে মার্কো। দুই মাস বয়সী এ ছোট্ট শিশু হয়তো বুঝতেই পারবে না, তার বাবা কী করেছেন। কিন্তু একদিন এই গল্পই হবে তার শোনা প্রথম বীরত্বের কাহিনি। দাদার ভঙ্গি, বাবার গোল, আর তাকে ঘিরে রাখা এক পরিবারের ত্যাগ। ডালাসে পর্তুগালের বিপক্ষে স্পেনের নাটকীয় লড়াই তখন নির্ধারিত সময়ের শেষের দিকে। সেই সময় বদলি হিসেবে মাঠে নামা মেরিনো জ্বলে উঠলেন। মাত্র ছয় মিনিট আগে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে ফাউলের শিকার হয়ে নিজেই দ্রুত ফ্রি-কিক নেন। সেই কিক বল পান ফ্যাবিয়ান রুইজ। সেখান থেকে ফেরান তোরেসের পায়ে। তোরেসের বাড়ানো পাস থেকে বক্সে ঢুকে গোলকিপার দিওগো কোস্তাকে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ালেন মেরিনো। পুরো স্টেডিয়াম তখন উল্লাসে কাঁপছে, স্পেন পেয়ে যায় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। এই দৃশ্য নতুন নয় মেরিনোর কাছে। ২০২৪ ইউরোতেও একইভাবে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে হেড থেকে গোল করে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনি। এই পথটা মোটেই সহজ ছিল না।
বছরের শুরুতেই চোটে পড়েন মেরিনো। পায়ে ধরা পড়ে স্ট্রেস ফ্র্যাকচার। অর্থাৎ হাড়ে সূক্ষ্ম ফাটল, যা সহজে সারে না। দুই মাস কাটাতে হয়েছে ক্রাচে ভর দিয়ে। জানুয়ারি থেকে বিশ্বকাপ শুরুর আগ পর্যন্ত মাঠে সময় পেয়েছেন মাত্র ২৮ মিনিট। একসময় নিজেই ভেবে নিয়েছিলেন, এই বিশ্বকাপ বোধহয় তার ভাগ্যে নেই। তবু কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ভরসা হারাননি। বলেছিলেন, দলে জায়গা রাখা হবে তার জন্য। মেরিনো যেন সেই বিশ্বাসের প্রতিদান দিতেই পর্তুগালকে বেছে নিলেন। এই কঠিন সময়ে মেরিনোর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন স্ত্রী লোলা। সাত-আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা থাকা অবস্থাতেও ছিলেন স্বামীর পাশে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় মেরিনোকে সাহায্য করেছেন। মেরিনো নিজেই গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন সেই কথা। তিনি বলেন, ‘ওই সময় আসলে আমারই ওকে সাহায্য করার কথা ছিল।’ চোটের সেই দিনগুলোয় একাকী কাটাতে হয়েছে মেরিনোকে। সময় কাটাতে বই পড়েছেন।
নিক হর্নবির লেখা বিখ্যাত বই ‘ফিভার পিচ’ ছিল তার সঙ্গী। তবে বেশিরভাগ সময় তিনি দিয়েছেন কঠোর পুনর্বাসনে। ম্যাচের পর সেসবই ফুটে উঠেছে মেরিনোর কণ্ঠে, ‘এমন মুহূর্তে সবকিছু মনে পড়ে। ভালো সময়, খারাপ সময়, বাড়িতে ফেলে আসা মানুষগুলোর কথা। চোট, ছেলেকে বড় হতে না দেখতে পারা-এসবই আমাকে আরও শক্তি দিয়েছে।’ সন্তান জন্মের পরও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাননি মেরিনো। মার্কোর আট সপ্তাহের জীবনের পাঁচ সপ্তাহই তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। স্পেন দলের হয়ে খেলতে। পরিবার থেকে দূরে থেকেও লক্ষ্য থেকে একবারও সরে যাননি তিনি। গোলের পর ক্যামেরার সামনে আবেগে ভেঙে পড়েন মেরিনো।
চোটের যন্ত্রণা, ছেলের বেড়ে ওঠায় পাশে থাকতে না পারার কষ্ট সবকিছুকেই তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। গলায় জড়ানো ছিল পামপ্লোনার সান ফার্মিন উৎসবের ঐতিহ্যবাহী লাল স্কার্ফ। কারণ, পামপ্লোনায় শুরু হয়েছে সান ফার্মিন উৎসব।
সাদা পোশাক আর লাল স্কার্ফে রঙিন পুরো শহর। মেরিনোর গোল যেন সেই উৎসবেরই আরেকটি পালক। গোলের পর বেঞ্চ থেকে ছুটে আসা সতীর্থরা মেরিনোকে উল্লাসে জড়িয়ে ধরেন। তারপর ছেড়ে দেন সেই চেনা উদযাপনের জন্য। কর্নার ফ্ল্যাগ ঘিরে সেই বৃত্ত, যা বাবার থেকে পাওয়া, এখন ছেলের নামে উৎসর্গ করা। এর মাধ্যমে জীবনের বৃত্তটা পূরণ হলো মেরিনোর। এক প্রজন্মের ত্যাগ, আরেক প্রজন্মের অপেক্ষা, আর মাঝখানে একটি গোল-যা সবকিছুকে জুড়ে দিল একসূত্রে।
