মাদেইরার একাকী বালক থেকে বিশ্ব ফুটবলে অমরত্ব

মাদেইরার একাকী বালক থেকে বিশ্ব ফুটবলে অমরত্ব

ফন্ট সাইজ:

ডালাসে তখনো স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হারের স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন পর্তুগাল। এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে মিকেল মেরিনোর যোগ করা সময়ের গোলটি যখন পর্তুগিজদের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিলো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছিলেন- তার জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি শেষ হয়ে গেছে। বিষাদে পর্তুগাল যখন কাঁদছে, তখন আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে এক চিলতে দ্বীপ মাদেইরা তার নিজের ছেলেকে বিদায় জানাচ্ছিল এক অভূতপূর্ব রাজকীয়তায়। মাদেইরার রাতের আকাশ আচমকাই আলোকময় হয়ে ওঠে। শত শত ড্রোন আকাশে উড়ে গিয়ে তৈরি করে এক অবয়ব। ড্রোনের বিন্দু বিন্দু আলোয় ভেসে ওঠে রোনালদোর চিরচেনা ৭ নম্বর জার্সি পরা ছবি, আর তার মাথার উপর লেখা- ‘অব্রিগাদো ৭ (ধন্যবাদ ৭)’।

তার পর পরই ড্রোনগুলো আকাশে ফুটিয়ে তোলে রোনালদোর সেই ট্রেডমার্ক ‘সিউউউ’ উদ্‌যাপনের ভঙ্গি। নিচে জড়ো হওয়া হাজারো মানুষ তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠছিলেন-‘সিউউউ’। হোমটাউনের এই ভালোবাসা যেন এক লহমায় মুছে দিতে চাইলো ডালাসের মাঠের সমস্ত কান্না আর বিষাদ। রোনালদোর বিদায়ের মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এক নির্মম যুদ্ধের ময়দান। রোনালদোর প্রস্থানকে কেন্দ্র করে নেটদুনিয়া এখন স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত। একদল নেটিজেন ও ফুটবল বিশ্লেষক এখন সিআরসেভেনকে ধুয়ে দিতে কোনো কার্পণ্য করছেন না। বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভে স্কাই স্পোর্টসের পণ্ডিত ক্রিস সাটন যেমন চরম নিষ্ঠুর ভাষায় রোনালদোকে আক্রমণ করে বলেছেন, ‘সে মাঠে একজন দাদুর মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে বেড়িয়েছে, আর ঠিক এই কারণেই পর্তুগাল আজ বিশ্বকাপ থেকে আউট হয়ে গেল।’ একদল সমর্থক সাটনের এই সুরেই সুর মিলিয়ে রোনালদোর বর্তমান ফর্ম আর দলের ওপর তার একচ্ছত্র প্রভাব নিয়ে ট্রল করছেন।

অন্য দলটির কাছে রোনালদো এক আবেগের নাম, যাকে তারা পরম মমতায় আগলে রাখছেন। তাদের মতে, ৪১ বছর বয়সেও এই মানুষটি যা করেছেন, তা মানবীয় ক্ষমতার বাইরে। পর্তুগালের বিদায়ী কোচ রবার্তো মার্টিনেজও ম্যাচ শেষে এই সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে রোনালদোকে আগলে রেখে বলেছেন, ‘যখন আপনার দলের একটা গোল দরকার, তখন আপনি তাকে (রোনালদোকে) মাঠ থেকে তুলে নিতে পারেন না। বক্সে তার অভিজ্ঞতা এবং সেট-পিস বা ওপেন স্পেসে তার সামর্থ্য অতুলনীয়। সে শুধু গোলের জন্য নয়, একজন অনুকরণীয় অধিনায়ক হিসেবে ড্রেসিংরুমে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তা চিরকাল মনে থাকবে।’ রোনালদোর এই অমরত্বের পেছনে যে গল্পটা লুকিয়ে আছে, তা কোনো রূপকথা নয়, বরং চরম এক একাকীত্ব আর ডিসিপ্লিনের গল্প। ১৯৮৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি মাদেইরার ফুনচালের এক অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া ছেলেটির কাছে ফুটবল কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। মা মারিয়া দোলোরেস দিন-রাত খাটতেন, আর বাবা হোসে দিনিস আভেইরো জড়িয়ে ছিলেন স্থানীয় ক্লাব আনদোরিনিয়ার সঙ্গে, যেখানে ক্রিস্টিয়ানোর ফুটবলের হাতেখড়ি।

মাত্র ১২ বছর বয়সে স্পোর্টিং সিপি তাকে নিয়ে আসে লিসবনে। সেই মুহূর্তটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় কোরবানি। ১২ বছরের একজন কিশোর নিজের পরিবার, চেনা দ্বীপ ছেড়ে একা চলে পাড়ি দেয় এক অচেনা শহরে। লিসবনে তাকে সইতে হয়েছে চরম একাকীত্ব। মফস্বলের উচ্চারণের জন্য সহ্য করতে হয়েছে সতীর্থদের টিটকারি, শুনতে হয়েছে তার রোগা শরীর নিয়ে হাজারো সন্দেহ। কিন্তু রোনালদো দমে যাননি। একাকীত্বকে বদলে নিয়েছিলেন কঠোর পরিশ্রমে। ২০০৩ সালে স্পোর্টিং সিপির বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচের পর স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন তাকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন। পরেরটুক ইতিহাস। ইউনাইটেড তাকে দিয়েছিল বৈশ্বিক মঞ্চ, আর রিয়াল মাদ্রিদ তাকে রূপান্তর করেছিল এক অতিমানবীয় গোলমেশিনে।

যারা আজ রোনালদোর শেষ ম্যাচ দেখে তাকে ব্যর্থ বলছেন, তারা আসলে ইতিহাস ভুলে গেছেন। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যুগের আগে পর্তুগাল তাদের পুরো ইতিহাসে বিশ্বকাপে খেলতে পেরেছিল মাত্র ৩ বার! কোনো বড় ট্রফি ছিল না। ইউসেবিও বা লুইস ফিগোদের মতো কিংবদন্তিরা যা পারেননি, রোনালদো তা করে দেখিয়েছেন। তার হাত ধরেই পর্তুগাল আজ বিশ্ব ফুটবলে এক পরাশক্তি। ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২৩৩ ম্যাচ খেলেছেন রোনালদো। গোল করেছেন রেকর্ড ১৪৬টি, অ্যাসিস্ট ৪৬টি। বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল! তার জমানায় পর্তুগাল জিতেছে ৩টি আন্তর্জাতিক ট্রফি, যার মধ্যে সবচেয়ে গৌরবময় ২০১৬ সালের ইউরো শিরোপা।
ডালাসের ম্যাচ শেষে রোনালদো বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে এভাবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে। তবে আমি আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। আমি একদম পরিষ্কার বিবেক নিয়ে মাঠ ছাড়ছি।

আমার আগে পর্তুগাল কোনো বড় ট্রফি জেতেনি। তাই ২০১৬ সালের ইউরো জয়টি আমার কাছে একটি বিশ্বকাপ জয়ের সমতুল্য। তাই আমি শান্ত মনেই বিদায় নিচ্ছি।’ বিশ্বকাপের ট্রফিটা ছোঁয়া হলো না। কিন্তু ট্রফি দিয়ে লেগাসি মাপা যাবে না। তিনি শুধু পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাস বদলাননি, বদলে দিয়েছেন ফুটবল খেলাটার ডিএনএ। পর্তুগালের জার্সিতে বিশ্বমঞ্চে তাকে আর দেখা যাবে না। কিন্তু তিনি পর্তুগালকে এমন এক ফুটবল সংস্কৃতি এবং এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে অনুপ্রেরণা দিয়ে গেলেন, যারা আগামী দিনে হয়তো বিশ্ব শাসন করবে।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন