যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক হামলা, মসজিদ ও ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টারে হুমকির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক হামলা ও নিরাপত্তা হুমকির কারণে দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
চলতি বছরের গত মে মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগোর বৃহত্তম মসজিদ ইসলামিক সেন্টার অব সান দিয়েগোতে স্থানীয় ডানপন্থি উগ্রবাদীদের বন্দুক হামলায় একজন নিহত হন। এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুতর হামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সান দিয়েগো শাখার কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (সিএআইআর) নির্বাহী পরিচালক তাজহিন নিজাম দ্য নিউ আরবকে বলেন, আগে মসজিদটি সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে হামলার পর এখন প্রবেশকারীদের পরিচয় যাচাই করে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ এখন আর জনসমাগমস্থলে নিরাপদ বোধ করেন না।
গত দুই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট ও মিশিগানের দুটি মসজিদে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা ঘটেছে। একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের একটি মসজিদেও।
এসব ধারাবাহিক হামলা ও হুমকির কারণে উত্তর আমেরিকার অনেক মুসলিম প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে বড় ধরনের কোনো হামলার পর অনুকরণমূলক হামলার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
রেকর্ডসংখ্যক ইসলামবিদ্বেষী অভিযোগ
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে সিএআইআর জানায়, ২০২৪ সালে তারা মুসলিম ও আরবদের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৬৫৮টি বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক ঘটনার অভিযোগ পেয়েছে, যা ১৯৯০-এর দশক থেকে তথ্য সংরক্ষণ শুরু করার পর সর্বোচ্চ।
এসব অভিযোগের প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল সরাসরি ঘৃণাজনিত অপরাধ (হেট ক্রাইম)। সংস্থাটি জানিয়েছে, চলতি বছরের তথ্য-উপাত্তও প্রায় একই মাত্রার ইসলামবিদ্বেষী ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গাজা যুদ্ধের পর বেড়েছে বিদ্বেষ
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষ নতুন নয়। তবে ২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মুসলিম ও তাদের উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে হামলা ও ঘৃণামূলক ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যও পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। এছাড়া ইরানকে ঘিরে তার সাম্প্রতিক সামরিক অবস্থান এবং মিনেসোটার সোমালি সম্প্রদায় নিয়ে তার বক্তব্যও মুসলিমবিদ্বেষকে উসকে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেশি হামলার শিকার মিনেসোটা
গত চার বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদে হামলা ও হুমকির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য। সেখানে ৪৪টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় এ ধরনের ৮টি ঘটনা ঘটেছে।
গত মঙ্গলবার মিনেসোটার সোমালি সম্প্রদায়ের এক ইমামকে টেক্সাসে মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (আইসিই) আটক করেছে। তবে ঠিক কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সিএআইআর-মিনেসোটার উপ-নির্বাহী পরিচালক আদান সুলেইমান দ্য নিউ আরবকে বলেছেন, এখন ঘটনাগুলো আমাদের খুব কাছাকাছি ঘটছে। প্রতিনিয়ত এমন কাউকে চিনি, যিনি কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তার ভাষায়, মানুষ ভয় ছাড়া স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারছে না। কেউ যখন মসজিদে আল্লাহর ইবাদত করতে যায়, তখনও মনে প্রশ্ন জাগে- আমার সঙ্গেও কি কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে?
ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মসজিদ নিরাপত্তা জোরদার করেছে। কোথাও অগ্নিনিরোধক ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে, কোথাও নিয়োগ দেয়া হয়েছে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী।
তবে মুসলিম নেতারা বলছেন, কঠিন এই সময়ে স্থানীয় অমুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন তাদের আশাবাদী করে তুলছে। হামলার পর অনেক প্রতিবেশী মসজিদে ফুল ও সংহতির বার্তা পাঠিয়েছেন।
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার লা মারিদা মসজিদও সম্প্রতি হুমকিমূলক চিঠি পেয়েছে। মসজিদের সভাপতি রেজাউর রহমান জানান, সান দিয়েগোর হামলার পরও তারা আগামী অক্টোবরে নির্ধারিত ‘ওপেন হাউস’ কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।
তিনি বলেন, আমরা শুধু এই সমাজে বসবাস করি না, আমরাই এই সমাজের অংশ।
