ইন্দোনেশিয়াকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করবে ভারত। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং শিল্প সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর এ তথ্য জানিয়েছেন ভারতের এক কর্মকর্তা। খবর বার্তাসংস্থা এএফপির। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর আমন্ত্রণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাকার্তায় রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল, ভারতের ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে চুক্তি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জানান, সফরকালে ‘ব্রহ্মস সিস্টেমে সহযোগিতা’ বিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দুই দেশ আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র (এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল) সহযোগিতা সম্পর্কেও একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে, যা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও বাড়াবে। তবে চুক্তির আর্থিক মূল্য বা অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেননি। প্রেসিডেন্ট প্রাবোওর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের নরেন্দ্র মোদি বলেন, জাকার্তা ও নয়াদিল্লির মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক আস্থা প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, আজ আমরা প্রতিরক্ষা বিনিময়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং শিল্প সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছি। মোদি জানান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কোস্টগার্ড ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করবে।
এশিয়ার বৃহত্তম দুই গণতান্ত্রিক দেশ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও ইস্পাত শিল্পেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিকেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উৎপাদনে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। মোদি বলেন, স্টেইনলেস স্টিল ও বিরল মাটির (রেয়ার আর্থ) চুম্বক উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের দুই দেশের কোম্পানির মধ্যে নতুন অংশীদারিত্বের সূচনা হচ্ছে।” অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি জানান, উভয় নেতা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানো এবং একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন।
এছাড়া, উভয় নেতা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা প্রামবানান মন্দির পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়েছেন। বুধবার তারা যৌথভাবে যোগ্যাকার্তায় অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মন্দির পরিদর্শন করবেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড সফরে যাবেন। এর আগে ভারতীয় সূত্র রয়টার্সকে জানায়, প্রায় ৬৩ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মোদির সফর চলাকালেই সই হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের প্রতিরক্ষা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করবে।
একই সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির গুরুত্বও বাড়ছে। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি স্থল, সমুদ্র এবং আকাশ- তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়। অন্যদিকে, অ্যাস্ট্রা বিয়ন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ (বিভিআর) এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ইন্দোনেশিয়ান বিমানবাহিনীর রুশ নির্মিত সুখোই যুদ্ধবিমানে সংযোজন করা সম্ভব। গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে ভারত প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এ অস্ত্রের প্রতি আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ভারত ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনসের কাছে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অর্ধডজনেরও বেশি দেশ এ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
