দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত মেমোরি চিপের বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তাদের মুনাফা প্রায় ১৮০০ শতাংশ বেড়েছে, যা আগের চেয়ে প্রায় ১৯ গুণ বেশি। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিয়েছে, এপ্রিলের শুরু থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে তাদের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ওন । এই অর্থ প্রায় ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন পাউন্ড বা ৫৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সমান। এটি টানা তৃতীয় প্রান্তিক, যেখানে স্যামসাং রেকর্ড পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের ধারণা দিতে বিস্তারিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে সাধারণত আয়-সংক্রান্ত পূর্বাভাস প্রকাশ করে থাকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এই পূর্বাভাসটি চলতি মাসের শেষ দিকে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ফল প্রকাশের আগে দেয়া হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা এখনও সরবরাহের চেয়ে বেশি থাকায় চিপের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্যামসাংয়ের আয়-সংক্রান্ত এই পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আলোচ্য প্রান্তিকে তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭১ ট্রিলিয়ন ওন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চ-এর বিশ্লেষক মার্ক আইনস্টাইন বলেন, এটি স্যামসাংয়ের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল। তার মতে, এ বছরের শুরুতে এনভিডিয়া যে রেকর্ড গড়েছিল, স্যামসাংয়ের ফলাফল তার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, এর পুরো কৃতিত্বই এআই-নির্ভর বাজারের উত্থানকে দিতে হবে। সীমিত সরবরাহ এবং নজিরবিহীন চাহিদার কারণে মেমোরি চিপ নির্মাতারা বিশাল সুবিধা পাচ্ছে। সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকায় স্যামসাং তাদের মেমোরি চিপের দামও বাড়িয়েছে। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি জানিয়েছে, ডাটা সেন্টার এবং এআই অবকাঠামোর জন্য সেমিকন্ডাক্টরের যে চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা মেমোরি শিল্প আগে কখনও দেখেনি। এর ফলে দৈনন্দিন ব্যবহারের ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য চিপ সরবরাহও প্রভাবিত হচ্ছে। আইডিসির প্রযুক্তি বিশ্লেষক ব্রায়ান মা বলেন, এআই ডাটা সেন্টারের চাহিদা কমার কোনো লক্ষণ নেই। তাই আগামী বছরজুড়েও চিপের সরবরাহ সংকুচিত থাকবে বলে আমরা মনে করছি।
স্যামসাং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। তারা এনভিডিয়া, গুগলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য চিপ তৈরি করে। পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যও উৎপাদন করে। এআই চিপের ব্যাপক চাহিদার কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামও দ্রুত বেড়েছে। তবে মঙ্গলবার সিউল শেয়ারবাজারে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশের বেশি কমে যায়। কারণ, অনেক বিনিয়োগকারী আরও বেশি মুনাফার প্রত্যাশা করেছিলেন। তবুও চলতি বছরের শুরু থেকে স্যামসাংয়ের বাজারমূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্স-এর বাজারমূল্য ২০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী পারফরম্যান্সের ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কসপি চলতি বছরে ৮০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
গত মে মাসে এনভিডিয়া রেকর্ড পরিমাণ ত্রৈমাসিক বিক্রি ও মুনাফার ঘোষণা দেয়। জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে তাদের আয় ৮০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে সেই সময় এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম কমে যায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এআই চিপ বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে- এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। গত জুনে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ঘোষণা দেয়, আগামী কয়েক বছরে দেশের চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স-এর নেতৃত্বে বিভিন্ন প্রকল্পে অন্তত ৮৮০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এদিকে জাপান, চীন ও তাইওয়ানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই চিপের দ্রুত বাড়তে থাকা চাহিদা মেটাতে নতুন চিপ কারখানায় ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
