একটি ছোট জাপানিজ ম্যাকাও (বানর) ছানা, নাম পাঞ্চ। তার সঙ্গী বলতে এখন শুধুই একটি ওরাংওটাংয়ের খেলনা পুতুল। মা তাকে জন্ম দিয়েই ত্যাগ করেছেন, আর নিজের দলের বড় সদস্যদের কাছে সে প্রতিনিয়ত নিগৃহীত হচ্ছে। সমপ্রতি জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানার এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্ব জুড়ে বইছে সহানুভূতির জোয়ার। কিন্তু পাঞ্চের এই নিঃসঙ্গতা কি কেবলই একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির কোনো রূঢ় নিয়ম?
গত জুলাইয়ে জন্ম নেয়া পাঞ্চের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। সাধারণত জাপানি ম্যাকাও ছানারা জন্মের পরপরই মায়ের শরীর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বড় হয়। এতে তাদের পেশি শক্ত হয় এবং তারা নিরাপদ বোধ করে। কিন্তু পাঞ্চের মা ছিল অনভিজ্ঞ, অর্থাৎ প্রথমবার মা হওয়া। বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহির মতে, অনভিজ্ঞতা এবং সে সময়কার তীব্র দাবদাহ পাঞ্চের মাকে এতটাই চাপে ফেলেছিল যে, সে নিজের বেঁচে থাকাকেই প্রাধান্য দিয়ে সন্তানকে ত্যাগ করে।
মা না থাকায় চিড়িয়াখানার কর্মীরা পাঞ্চকে একটি ওরাংওটাংয়ের পুতুল দেন। এখন সেই নির্জীব পুতুলটিই পাঞ্চের একমাত্র আশ্রয়। ভিডিওতে দেখা যায়, অন্য বানররা যখন তাকে তাড়া করে বা টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়, সে তখন প্রাণপণে পুতুলটিকে জড়িয়ে ধরে পাথরের আড়ালে লুকায়।
ভিডিওগুলোতে পাঞ্চকে অন্য বানরদের দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখে নেটিজেনরা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিজ্ঞানীরা একে দেখছেন ভিন্ন চোখে। জাপানিজ ম্যাকাওদের সমাজে একটি কঠোর স্তরবিন্যাস কাজ করে। বড় এবং শক্তিশালী পরিবারগুলো ছোটদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করবে- এটাই তাদের স্বাভাবিক নিয়ম।
তবে সমস্যাটা অন্য জায়গায়। মায়ের অনুপস্থিতিতে পাঞ্চ শিখতে পারছে না কীভাবে বড়দের কাছে বশ্যতা স্বীকার করতে হয়। এই সামাজিক শিক্ষার অভাবে ভবিষ্যতে দলের সঙ্গে তার পুরোপুরি মিশে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
২০২৪ সালে থাইল্যান্ডের পিগমি হিপ্পো ‘মু ডেং’-এর মতো পাঞ্চও এখন একজন ‘ইন্টারনেট সেলিব্রেটি’। তাকে দেখতে চিড়িয়াখানায় ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা বেষ্টনী, দর্শকদের বলা হচ্ছে নীরব থাকতে।
তবে এই জনপ্রিয়তার অন্ধকার দিক নিয়ে সতর্ক করেছেন সংরক্ষণ মনোবিজ্ঞানী কার্লা লিচফিল্ড। তিনি বলেন, মানুষ ছোট বানরছানা দেখে কিউট মনে করে বাড়িতে পুষতে চায়। কিন্তু কয়েক বছর পরই তারা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বানরদের জায়গা তাদের নিজেদের প্রজাতির সঙ্গেই, মানুষের ড্রয়িংরুমে নয়।
পাঞ্চের এই ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয় জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত চাপের প্রভাব প্রাণীকুলের ওপর কতোটা গভীর হতে পারে। একটি পুতুল হয়তো পাঞ্চকে সাময়িক মানসিক শান্তি দিচ্ছে, কিন্তু প্রকৃতির রূঢ় বাস্তবতাকে সে কতোটা জয় করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। আপাতত, লাখো মানুষের প্রার্থনা একটাই- পুতুল নয়, পাঞ্চ যেন তার দলের ভেতরেই নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে পায়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
পুতুল জড়িয়েই কাটছে শৈশব
জাপানি বানরছানা পাঞ্চের একাকিত্বের গল্প
মানবজমিন ডেস্ক
২৫ ফেব্রুয়ারি (বুধবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
