রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এমন পরিস্থিতির মধ্যে একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট সামনে এসেছে। একটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধনির্ভর অর্থনীতির চাপ বহন করতে গিয়ে রাশিয়ার ব্যাংকিং খাত ২০২৬ সালে গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।
রয়টার্সের দেখা দুই পৃষ্ঠার একটি গোয়েন্দা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয় সামাল দিতে রুশ সরকার ক্রমেই ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনটির শিরোনাম ‘২০২৬ সালে রাশিয়ায় ব্যাংকিং সংকটের সম্ভাবনা’। এতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিপ্রাপ্ত ঋণ, ঋণ পুনর্গঠন এবং সরকারি সহায়তার কারণে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক দুর্বলতা আপাতত আড়ালে রয়েছে। তবে নতুন ও কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা শিল্প, আবাসন খাত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ দিতে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে এমন ঋণের পরিমাণ বেড়েছে, যেগুলোর বড় অংশ ভবিষ্যতে আদায় না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে করপোরেট ঋণের প্রায় ১০ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে কয়েকটি বড় ব্যাংকে খারাপ খুচরা ঋণের হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পাঁচ লাখের বেশি রুশ নাগরিক দেউলিয়া ঘোষণা করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। একই সময়ে সরকারি ঋণ কর্মসূচির আওতায় এক কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ অন্তত তিনটি করে ঋণ নিয়েছেন।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমছে
রাশিয়ার অর্থনীতি ধীরগতির হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়েছে। ২০২৭ সালের পূর্বাভাসও ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
যদিও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ব্যাংকিং সংকটের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে, রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে মন্তব্য করেনি।
তবে গত মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপ-গভর্নর ফিলিপ গাবুনিয়া বলেন, দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেনি। তাঁর দাবি, ব্যাংকগুলোর মূলধন সুরক্ষা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং করপোরেট খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৪ শতাংশেই স্থির রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো অ্যাডভাইজরির রাশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস উইফার মনে করেন, রাশিয়ার অর্থনীতি স্থবির হলেও প্রতিরক্ষা ব্যয় এখনো অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
তার ভাষায়, রাশিয়ার অর্থনীতি স্থবির, কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয় তাৎক্ষণিক কোনো আর্থিক সংকট সৃষ্টি হতে দিচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, এশিয়ার অনেক দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে মানছে না। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা দিলেই রাশিয়া বড় সংকটে পড়ে যাবে- এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা বর্তমানে রাশিয়ার ব্যাংক, ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্ক, ড্রোন উৎপাদন, তেল ব্যবসায়ী ও পরিশোধন শিল্পের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করছেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আরও প্রায় ৯০টি ব্যাংককে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনাকারী রাশিয়ার অর্ধেকেরও বেশি ব্যাংক পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসবে।
