স্বপ্নের বিপরীতে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

আইবেরিয়ান ডার্বি

স্বপ্নের বিপরীতে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই

ফন্ট সাইজ:

কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতার বয়স ক্যালেন্ডারে মাপা যায় না। সময়ের সঙ্গে সেগুলো আরও গভীর হয়। স্পেন-পর্তুগালের আইবেরিয়ান ডার্বি তেমনই এক গল্প। যেখানে নব্বই মিনিটের লড়াইয়ে মিশে থাকে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর মর্যাদার প্রশ্ন। আর বিশ্বকাপ? এই দ্বৈরথের রাজসাক্ষী। ২০১০ সালে শেষ ষোলোতে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে থেমে গিয়েছিল পর্তুগালের স্বপ্নযাত্রা। আট বছর পর রাশিয়ায় সেই স্পেনের বিপক্ষেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো উপহার দিলেন এক স্মরণীয় সন্ধ্যা। হ্যাটট্রিক করলেন। কিন্তু জয় অধরাই থেকে গেল। শেষ বাঁশিতে স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল ৩-৩ সমতা। আট বছর পর আরেকটি আইবেরিয়ান ডার্বি।

একদিকে রোনালদো, অন্যদিকে লামিন ইয়ামাল। ডালাসে দুই ভিন্ন প্রজন্মের শেষ ষোলোর লড়াইটা শুরু হবে রাত ১টায়। রোনালদোর কাছে ম্যাচটি শুধু পুরনো হিসাব চুকানোর নয়, বিশ্বকাপ স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার লড়াইও। আর লামিনের জন্য শ্রেষ্ঠত্ব জানান দেওয়ার উপলক্ষ্য। রাউন্ড ৩২-তে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারানোর পরই লামিন বলেছিলেন, ‘আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সামনে যেই আসুক আমরা ভীত নই।’

আরও পড়ুন:
কাঁদছে ইরান

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ ছাড়া সবই জিতেছেন ক্রিস্টিয়ানো। সোনায় মোড়ানো ট্রফিটা একটি বার ছুঁয়ে দেখতে চেষ্টার কোনো কমতি রাখেননি। সফল হননি। তবে হালও ছাড়েননি। ৪১ বছর বয়সেও তাড়া করে বেড়াচ্ছেন আরাধ্য স্বপ্ন। কিন্তু পর্তুগাল ও রোনালদোর পথে বড় বাধা এখন স্পেন। যাদের বিপক্ষে ২০১১ সালের পর ৭ ম্যাচ খেললেও নির্ধারিত সময়ে কোনো জয় পায়নি পর্তুগাল। তাদের একমাত্র জয়টি ছিল গত বছর নেশনস লীগের ফাইনালে টাইব্রেকারে। আজকের লড়াইয়ে ওই ম্যাচ বড় অনুপ্রেরণা হতে পারে পর্তুগালের। তাছাড়া ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কঠিন ম্যাচ জেতাটাও আত্মবিশ্বাসী করে তোলেছে রোনালদোদের। পর্তুগিজ ডিফেন্ডার নুনো মেন্ডেস বলেন, ‘সেই (নেশনস লিগ) ফাইনালের ফল যদি পুনরাবৃত্তি করতে পারি, তাহলে দারুণ হবে। তবে এটি ভিন্ন একটি ম্যাচ, ভিন্ন প্রতিযোগিতা। এই টুর্নামেন্টে অন্য সব ম্যাচ যেভাবে খেলেছি, স্পেনের বিপক্ষেও আমাদের একইভাবে নামতে হবে।’

স্পেনেকেই সবচেয়ে বড় বাধা মানছেন মেন্ডেস। তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, যে হারবে, সেই বাড়ি ফিরে যাবে। কাগজে-কলমে স্পেনই এ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রতিপক্ষ। কিন্তু খেলা শুরু হয়ে গেলে সেটি কঠিনও হতে পারে, আবার সহজও হতে পারে।’

আর লামিন ইয়ামালের কাছে ‘সবচেয়ে কঠিন’ প্রতিপক্ষ হলেন নুনো মেন্ডেস। গত বছর নেশনস লিগের ফাইনালে নুনোর বিপক্ষে মোটেও সুবিধা করতে পারেননি ইয়ামাল। স্পেন ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক ডিফেন্ডার মাইকেল সালগাদো মনে করেন, নুনো-ইয়ামাল দ্বৈরথই আজকের ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, ‘যদি লামিন প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে তাহলে স্পেন অনেক বড় সুবিধা পাবে। উল্টোটা হলে পর্তুগালই এগিয়ে থাকবে। আমার মনে হয়, লড়াইটি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।’

পর্তুগালের রক্ষণভাগের আরেক খেলোয়াড় নেলসন সেমেদোও লামিন ইয়ামালকে সবচেয়ে বড় হুমকি মনে করেন। তবে দলগত পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সেমেদো। তিনি বলেন, ‘লামিন রত্নতুল্য। পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সক্ষমতা আছে তার। কিন্তু আমরাও দেখিয়েছি দল হিসেবে কতটা লড়াকু। স্পেনকে দলবদ্ধভাবেই আটকাতে হবে আমাদের। লামিনের ওপর বেশি মনযোগ দিলে অন্যদিকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। স্পেনে লামিন ছাড়াও খেলোয়াড় রয়েছে যারা ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।’

ইনজুরির কারণে এই ম্যাচেও নিকো উইলিয়ামস ও ইয়েরিমো পিনোকে পাচ্ছে না স্পেন। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোতেও এ দু’জনের খেলা অনিশ্চিত। ফলে স্পেনের দুই উইং সামলানোর দায়িত্ব যথারীতি লামিন ও আলেক্স বায়েনার কাঁধেই। মাঝখানে ইনফর্ম মিকেল ওয়ারজাবাল। রক্ষণে পাউ কুবার্সি, এমেরিক লাপোর্তের দুই পাশে পেদ্রো পোরো ও মার্ক কুকুরেয়া। তবে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আশানুরূপ খেলতে না পারায় দানি অলমো অথবা পেদ্রির মধ্যে একজন বাদ পড়তে পারেন। ফাবিয়ান রুইজের খেলার সম্ভাবনা প্রবল।

পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে প্রতি ৩৭ মিনিটে একটি গোল অথবা অ্যাসিস্ট করেছেন গঞ্জালো রামোস। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষেও জয়ের নায়ক ছিলেন তিনি। তারপরও আজকের ম্যাচে একাদশে রামোসের থাকা অনিশ্চিত। সম্ভবত অপরিবর্তিত একাদশ মাঠে নামাবেন কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। আক্রমণভাগে রোনালদোর সঙ্গে রাফায়েল লেয়াও, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, পেদ্রো নেতো অথবা বারনার্দো সিলভা। মাঝমাঠে ভিতিনহা, জোয়াও নেভেস। রক্ষণে জোয়াও ক্যানসেলো, রেনাতো ভেইগা, রুবেন দিয়াজ ও নুনো মেন্ডেস জায়গা ধরে রাখবেন। মুখোমুখি পরিসংখ্যানে পাল্লা ভারী স্পেনের। স্পেনের ১৮ জয়ের বিপরীতে পর্তুগাল জিতেছে ৭ বার। দু’লের ১৬ ম্যাচ সমতায় শেষ হয়।

ডি-বক্সের ভেতরে রোনালদোকে সমীহ করছেন স্পেনের বিশ্বরেকর্ডধারী গোলকিপার উনাই সিমোন
৪১ বছর বয়সী রোনালদোর জন্য অনেকে এটিকে শেষ বিশ্বকাপ মনে করলেও, টানা ৫১৯ মিনিট ধরে গোল না খাওয়া সিমোন তা মানতে নারাজ। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, রোনালদো তার ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে না থাকলেও ডি-বক্সের ভেতর এখনও সমান বিপজ্জনক।

রোনালদোর গোল করার সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে ইউরোজয়ী স্প্যানিশ কিপার সিমোন বলেন, ‘বিশ্বকাপে আমরা যে ক্রিস্টিয়ানোকে দেখছি, সে ছয়-সাত বছর আগের সেই চেনা ফর্মে নেই, যখন সে ক্যারিয়ারের চূড়ায় ছিল। তবে আমাদের চেষ্টা করতে হবে তাকে যেন বক্স থেকে যতখানি সম্ভব দূরে রাখা যায়। ন্যাশনস লীগের ফাইনালে সে বক্সের ভেতর মাত্র একটা বল পেয়েই গোল করেছিল। গোল করার এমন অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ওর আছে, যা দুনিয়ার সব দলই নিজেদের স্কোয়াডে চাইতে বাধ্য।’

রোনালদোর মিডিয়া হাইপ ও অবসর নিয়ে সিমোন স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমি মোটেও মনে করি না এটি ক্রিস্টিয়ানোর লাস্ট ডান্স। প্রতিটি ম্যাচই আলাদা। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো মাঠের খেলায় মনোযোগ দেয়া। মিডিয়াতে বাইরে কী আলোচনা হচ্ছে তা নিয়ে মাথা না ঘামানো।’

রোনালদোকে থামানোর এই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে সিমোন নিজেই এখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। শেষ ৩২-এর ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারানোর রাতে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নিজের নাম লিখিয়েছেন এই অ্যাথলেটিক বিলবাও তারকা। বিশ্বকাপে টানা সবচেয়ে বেশি সময় জাল অক্ষত রাখার (ক্লিন শিট) নতুন বিশ্বরেকর্ড এখন ২৯ বছর বয়সী সিমোনের দখলে।

১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালির কিংবদন্তি গোলকিপার ওয়াল্টার জেঙ্গার ৫১৮ মিনিট গোল না খাওয়ার দীর্ঘ ৩৬ বছরের পুরোনো রেকর্ডটি ভেঙে দিয়েছেন সিমোন। কাতার বিশ্বকাপের মরক্কো ও জাপান ম্যাচের কিছু অংশসহ চলতি বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়া, কেপ ভার্দে, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের বিপক্ষে জাল অক্ষত রেখে সিমোনের গোল না খাওয়ার রেকর্ড এখন টানা ৫১৯ মিনিটে দাঁড়িয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন