ইরানের রাজধানী তেহরানের কেন্দ্রীয় মসজিদে রোববার (৫ই জুলাই) স্থানীয় সময় সকাল আটটায় (বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ১০টা) আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। জানাজা শুরুর আগেই প্রিয় নেতাকে বিদায় জানাতে আসা মানুষের ক্রমবর্ধমান ভিড়ে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
রোববার ভোর থেকেই জানাজাস্থল তেহরানের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আর আশপাশের এলাকায় সমবেত হতে থাকেন লাখ লাখ নারী-পুরুষ। স্থানীয় মিডিয়ার বরাতে বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থান সংকুলান না হওয়ায় জানাজা শুরুর এক ঘণ্টা আগেই মসজিদ কমপ্লেক্সটির সবক’টি ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়।
পরে মসজিদের আশপাশের সড়ক ও উন্মুক্ত স্থানগুলোতে অবস্থান নেন জানাজার নামাজ পড়তে আসা মানুষেরা। জানাজার আগে সেসব জায়গাও কানায় কানায় ভরে যায়। জানাজা উপলক্ষে পুরো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক নজরদারি ছিল।
এদিন জানাজায় অংশ নেয়া প্রায় সবার চোখই পানিতে টলমল করছিল। কথা না বললেও তাদের চোখের চাহনিতে এক অব্যক্ত বেদনা ও সহমর্মিতা ফুটে ওঠে। সেইসঙ্গে তাদের চোখে-মুখে ক্ষোভের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট ছিল। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার আহ্বান জানান। সেই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পতন হোক বলেও স্লোগান দেন। তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এদিন তেহরানে শিয়া ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি তাবরিজি জানাজা নামাজের নেতৃত্ব দেন। এর আগে শনিবারই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে, বর্তমান সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি পিতার জানাজা পড়াবেন না।
প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে, জানাজার নামাজ তিন ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম ধাপে আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহের জন্য জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে তার কন্যা সাইয়্যেদেহ বুশরা খামেনি, জামাতা মেসবাহ আল-হুদা বাকেরি এবং পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেলের জন্য জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সর্বশেষ, তৃতীয় ধাপে খামেনির নাতনি, শিশু জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির জন্য জানাজার নামাজ আদায় করা হয়েছে।
রোববারের জানাজায় দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি জানাজায় অংশ নেন। এ ছাড়া জানাজায় উপস্থিত ছিলেন ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সর্বাধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি।
পাশাপাশি, জানাজা নামাজের সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন আলি খামেনির তিন ছেলে- মাসুদ, মাইসাম এবং মুস্তফা। তবে, অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাদের আরেক ভাই ও ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বাবার জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। বিভিন্ন মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলি গোয়েন্দারা মোজতবা খামেনিকে টার্গেট করতে পারে তাই জানাজায় তিনি হাজির হননি।
এদিকে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির একজন উপদেষ্টা মোহাম্মদ আলি আবতাহি অভিযোগ করেছেন যে, বিরোধী রাজনীতিক ও সাবেক কর্মকর্তাদের জানাজা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেয়া হয়নি। গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনীর অতর্কিত হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিনেই নিহত হয়েছিলেন ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এ ছাড়া একই দিনে দেশটির কয়েক ডজন শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডার ও খামেনির পরিবারের কয়েকজন সদস্য হামলায় নিহত হন। তবে ওইদিনের হামলায় ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান মোজতবা খামেনি।
এরপর তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে এখন পর্যন্ত তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ধারণা করা হয়েছিল, অন্তত বাবার জানাজায় মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যাবে কিন্তু তিনি আড়ালেই রইলেন।
বিবিসি জানিয়েছে, খামেনি নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর তার দাফন সম্পন্ন হচ্ছে। এজন্য দেশটি ৬ দিনের রাষ্ট্রীয় শোকপালন ও শেষ বিদায়ের নানা অনুষ্ঠান পালনের ঘোষণা দিয়েছে।
গত শুক্রবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আলি খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়েছিল। এরপর শনিবার সকাল স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে রোববার খামেনির জানাজা হয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা বিকাল পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, কয়েক দফা জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে আগামী বৃহস্পতিবার (৯ই জুলাই) আলি খামেনিকে দাফন করা হবে। ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের একটি ধর্মীয় পরিবারে ১৯৩৯ সালের ১৯শে এপ্রিল জন্ম হয়েছিল আলি খামেনির। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।
এই মাশহাদেই বৃহস্পতিবার আলি খামেনিকে দাফন করা হবে। তার বাবা সৈয়দ জওয়াদ খামেনি ছিলেন স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত একজন শিয়া পণ্ডিত। মা খাদিজে মির্দামাদীও একজন ধার্মিক নারী ছিলেন।
