যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নিয়ে আবারো কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে দেশটির অবশিষ্ট শীর্ষ নেতৃত্ব এক জায়গায় অবস্থান করছেন। চাইলে তিনি একটি হামলাতেই তাদের সবাইকে হত্যা করতে পারেন। তবে তিনি এমনটি করবেন না বলেও মন্তব্য করেন। কারণ তাহলে আলোচনার জন্য কেউই বেঁচে থাকবেন না। তবে ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে ইরান। আর্মেনিয়ায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেছে, মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ওরা সবাই সেখানে আছে। একটি হামলাই যথেষ্ট, আমরা সবাইকে সরিয়ে দিতে পারি। কিন্তু আমরা তা করবো না, কারণ তাহলে আলোচনা করার জন্য আর কেউ থাকবে না। তারা একটি সমঝোতা চুক্তি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তিনি আরও দাবি করেন, খামেনির দাফন শেষ না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ এক সপ্তাহের জন্য আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো পক্ষই অপর পক্ষের ওপর হামলা চালাবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
৩৬ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর দিন নিহত হন। ওই হামলার মধ্যদিয়েই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সূচনা হয়। মার্চ মাস থেকেই তার রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠানের সময়সূচি নিয়ে নানা জল্পনা চলছিল। ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দাফন সম্পন্ন করা হয়। তবে যুদ্ধাবস্থার কারণে এবার সেই নিয়মের ব্যতিক্রম করা হয়েছে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ২৫০তম বার্ষিকীর দিন ৪ঠা জুলাই খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠান শুরু করে ইরান। এর অংশ হিসেবে ৭ই জুলাই তেহরানের দক্ষিণে পবিত্র শহর কোমে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হবে। পুরো কর্মসূচি ৯ই জুলাই খামেনির জন্মস্থান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শহর মাশহাদে তার দাফনের মাধ্যমে শেষ হবে।
এই সময়ে লাখো মানুষ ইরানের বিভিন্ন সড়কে জড়ো হয়েছেন। ফলে খামেনির শেষ বিদায় বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। শনিবার বিদায় অনুষ্ঠানে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অশ্রুসিক্ত অবস্থায় দেখা যায়। ইরানি নেতাদের কান্নার এ দৃশ্য দেখে ট্রাম্প বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আমি তো ভেবেছিলাম মানুষ খামেনিকে ঘৃণা করে। এরপর তিনি যোগ করেন, হয়তো কান্নাগুলো নকল। এর আগে ট্রাম্প বলেন, খামেনির শেষকৃত্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘এক সপ্তাহের ছুটি’ দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা একদিনেই ভেনেজুয়েলাকে পরাজিত করেছি। আর ইরানকে ভয়াবহভাবে আঘাত করেছি। তারা এখন সমঝোতা করতে মরিয়া। তারা এতটাই সমঝোতা করতে চায় যে, আমরা ভালো মানুষ বলেই শেষকৃত্যের জন্য তাদের এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি।
ওদিকে, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া মোজতবা খামেনি তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না বলে ভারতে তার প্রতিনিধির বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ হাকিম এলাহি বলেছেন, ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলা ও নজরদারির ঝুঁকির কারণে মোজতবা খামেনির প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। তবে এ বিষয়ে ইরানের সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়া হয়নি।
‘মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু আদর্শকে নয়’
আর্মেনিয়ায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাস প্রয়াত ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের করা মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে দূতাবাস বলেছে, মানুষকে হত্যা করা যায়। কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না। পোস্টে আরও বলা হয়, খামেনিকে হত্যা করা হলেও তার আদর্শ ও উত্তরাধিকার টিকে থাকবে। দূতাবাস লিখেছে, আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন। কিন্তু বাস্তবে আপনারা একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছেন, যার সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় ট্রাম্পকে সরাসরি লক্ষ্য করেও কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে ইরানের দূতাবাস। পোস্টে বলা হয়, আপনি এসব বিষয় বুঝবেন না, কারণ আপনার সভ্যতা নেই, ইতিহাস নেই, সম্মানও নেই। খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া মানুষের সমাবেশ নিয়ে ট্রাম্প যে মন্তব্য করেছিলেন, তারই জবাবে এসব কথা বলা হয়েছে।
