বিদায়ী অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা

বিদায়ী অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ এক লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা

ফন্ট সাইজ:

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে এ নিয়ে আপাতত বড় কোনো ঝুঁকি দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, গত অর্থবছরে সরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম ছিল। পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকায় সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণে ব্যাংকিং খাতে সংকট তৈরি হবে না বা শিল্প খাতের অর্থায়নে চাপ পড়বে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগের ধীরগতির প্রতিফলন। এ বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৮ শতাংশ এবং অর্থবছর শেষে ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। ফলে সরকারের ঋণ গ্রহণের কারণে শিল্পকারখানা ও উৎপাদন খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিবেচনায় রেখে সরকারি ঋণ ও ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ০.৭০ শতাংশ বেড়েছে। তবে বার্ষিক ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.৭২ শতাংশ যা সাড়ে ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সরকারের তুলনামূলক উচ্চ ঋণগ্রহণও বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে সরকারি খাতে পুঞ্জীভূত ঋণ বেড়েছিল ৬.১৪ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে তা বেড়ে ১২.৩৬ শতাংশে পৌঁছায়। বার্ষিক হিসাবে সরকারের ঋণ বেড়েছে ৩৫.৯০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ই জুন পর্যন্ত সরকার যে নিট ঋণ নিয়েছে তার মধ্যে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪০২ কোটি টাকা এসেছে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে যা মোট ঋণের প্রায় ৯৪ শতাংশ। বাকি ৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি অর্থায়ন বা নতুন টাকা ছাপিয়ে ঋণ দেয়ার প্রবণতা সীমিত রাখা হয়েছে। ফলে সরকারের অর্থায়নের বড় অংশের চাপ পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। তাই সরকারি ঋণগ্রহণের কারণে শিল্প, উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহে তাৎক্ষণিক কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণের চাহিদার পরিবর্তন বিবেচনায় সরকারি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করছে। তবে বেসরকারি খাত এখনো পুরোপুরি ঋণ গ্রহণের অবস্থায় পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিনের ধীর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পর অনেক প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধার পর্যায়ে রয়েছে। তাই সরকারি ঋণের কারণে বেসরকারি খাত ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে- এমন পরিস্থিতি এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে।

মে ও জুন মাসে কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় করেছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণা ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় বাড়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক ঋণও বেড়েছে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতের দুর্বল কার্যক্রম রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সরকারি বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট কর আদায়ও কম হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতের কার্যক্রম ও রাজস্ব আদায় ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন