বিশ্বকাপে রাজনীতির আঁচড়! বিতর্কে ম্লান হচ্ছে ফুটবলের সৌন্দর্য?

ফন্ট সাইজ:

ফুটবল একসময় ছিল আবেগের ধর্ম, বিশ্বকাপ ছিল সেই ধর্মের মহাউৎসব। যেখানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করত খেলোয়াড়ের মেধা, কোচের কৌশল এবং মাঠের লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই মনে হচ্ছে বলের চেয়ে বাঁশির ক্ষমতা বড় হয়ে উঠেছে, খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন ভিডিও রুমে বসে থাকা কর্মকর্তারা, আর ফুটবলের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে রাজনীতি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ।

এমন বিশ্বকাপ ফুটবলপ্রেমীরা দেখতে চায়নি।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই বিতর্কের জন্ম। ভিসা জটিলতা, ইমিগ্রেশন হয়রানি, অ্যাক্রিডিটেশনধারী সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক সমস্যায় পড়তে হওয়া এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের ভ্রমণ বিঘ্নিত হওয়া প্রমাণ করেছে—বিশ্বকাপের মঞ্চেও ভূরাজনীতির ছায়া স্পষ্ট। ফিফা সবসময় বলে, "ফুটবল সবার"। কিন্তু বাস্তবতা যেন বলছে, সবাই সমান নয়।

আর মাঠে খেলা শুরু হওয়ার পর বিতর্ক যেন বিস্ফোরণের রূপ নেয়। প্রযুক্তি মানুষের ভুল কমানোর জন্য এসেছিল। কিন্তু ভিএআর আজ এমন এক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার ব্যাখ্যা একেক ম্যাচে একেক রকম। একই ধরনের ফাউলে এক ম্যাচে পেনাল্টি, অন্য ম্যাচে খেলা চলতে থাকে। একই ধরনের অফসাইড এক জায়গায় ধরা পড়ে, অন্য জায়গায় উপেক্ষিত হয়। এতে প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নয়, বরং তার প্রয়োগের ধারাবাহিকতাই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

বেলজিয়াম–সেনেগাল ম্যাচটি সেই বিতর্কের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে দেওয়া পেনাল্টি শুধু একটি ম্যাচের ফল বদলায়নি; কোটি দর্শকের মনে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—বিশ্বকাপে কি সত্যিই মাঠের লড়াইয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে?

গ্যারি নেভিল বলেছেন, এটি কোনোভাবেই পেনাল্টি ছিল না। রয় কিন সিদ্ধান্তটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর বলেছেন। জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ আরও এক ধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেছেন, সেনেগালকে "ডাকাতি" করা হয়েছে। এগুলো ব্যক্তিগত মতামত হলেও, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাবেক খেলোয়াড় ও বিশ্লেষকেরা একই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন বিতর্ক আর বিচ্ছিন্ন থাকে না।

শুধু সেনেগাল নয়। জার্মানির বাতিল হওয়া গোল, ইরানের অফসাইড সিদ্ধান্ত, ঘানার সম্ভাব্য পেনাল্টি না পাওয়া—সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের মান কি সত্যিই বিশ্বমানের?

বিশ্বকাপের প্রথম বাঁশি বাজার পর থেকেই একজন দর্শক হিসেবে আমার মনে হচ্ছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট দলকে জেতানোর লক্ষ্য নিয়েই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ফিফা। কারণ যে ফাউলে একজন খেলোয়াড়কে হলুদ কিংবা লাল কার্ড দেখাচ্ছে রেফারি। সেই একই অপরাধে মেসিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে! সার্বিক প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, ফুটবলের সৌন্দর্য রক্ষার বদলে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও মুনাফার দিকেই বেশি নজর ফিফার।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রতিটি বিতর্কের পর ফিফার নীরবতা। যে সংস্থা স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার কথা বলে, সেই সংস্থাই বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাখ্যা দিতে অনাগ্রহী। ভিএআর কক্ষে কী আলোচনা হয়েছে, কোন যুক্তিতে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়েছে—এসব বিষয়ে দর্শকদের সামনে কার্যকর স্বচ্ছতা নেই। ফলে সন্দেহ আরও গভীর হয়।

বিশ্বকাপ কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে কোটি কোটি মানুষের আবেগ নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। এটি এমন একটি আসর, যেখানে প্রতিটি বাঁশি ইতিহাস লিখে দেয়, একটি সিদ্ধান্ত কোটি মানুষের কান্না কিংবা উল্লাসের কারণ হয়। সেই সিদ্ধান্ত যদি ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে হার শুধু একটি দলের নয়—হার ফুটবলের।

ফিফার মনে রাখা উচিত, প্রযুক্তি ফুটবলকে সাহায্য করার জন্য এসেছে; ফুটবলকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়। রেফারি যদি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের সিদ্ধান্তের বদলে ভিডিও মনিটরের ওপর নির্ভর করেন, তাহলে মাঠের কর্তৃত্ব হারিয়ে যায়। আর যখন দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে রেফারির বাঁশি, খেলোয়াড়ের গোল নয়—তখন বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও ফুটবলের সৌন্দর্য হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বকাপকে যদি সত্যিই বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসর হিসেবে ধরে রাখতে হয়, তাহলে ফিফাকে শুধু নিরপেক্ষ থাকার দাবি করলেই চলবে না; সেই নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান প্রমাণও দিতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপকে অসাধারণ ফুটবলের জন্য নয়, বরং বিতর্ক, বিতণ্ডা এবং প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্তের বিশ্বকাপ হিসেবেই মনে রাখবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন