পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত: ন্যায়বিচার, আস্থা ও পেশাদারিত্ব

পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত: ন্যায়বিচার, আস্থা ও পেশাদারিত্ব

ফন্ট সাইজ:

বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার, প্রতিহিংসা চরিতার্থের কাণ্ডকীর্তি কেবল সিভিল প্রশাসন নয়- সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীতেও যথেচ্ছা হয়েছে। আওয়ামী লীগ জমানার সেই নিপাতনে সেদ্ধ হওয়াদের মধ্য থেকে অন্তত ১৫০ জনের বিষয়ে অবশেষে সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। জবরদস্তিতে অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত (চাকরিচ্যুত) অফিসারকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যোগ্যতা অনুযায়ী তিন বাহিনীর ১৫০ জন অফিসারকে স্বাভাবিক অবসর, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিধি অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা, আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনাও দেয়া হবে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপ তথ্য বলছে, এ ১৫০ জনের মধ্যে সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌ-বাহিনীর ২১ জন এবং বিমান বাহিনীর ১৪ জন। প্রজ্ঞাপনটি জারি না হলে আওয়ামী লীগ আমলের সেই কালো কাজের কথা হয় তো জানাও হতো না। এই সরকার সবিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেই সরকারের অপকাজের একটি হিল্লা করেছে। বৈষম্য-নিগৃহিতের শিকার ও তাদের পরিবারের কাছে তা স্বস্তির। আর দেশবাসীর কাছে একটি বার্তা। ভেজাল বা অন্যায় করতে নিয়ম লাগে না। সেই ভেজালের বিহিত করতে হয় নিয়ম-নীতির মাধ্যমে।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখায় চাকরিতে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করতে গিয়ে সরকারকে ঠিকই একটা পদ্ধতিতে যেতে হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করেছে। তিন বাহিনীর সদর দপ্তরকেও পর্ষদ গঠন করতে হয়েছে। পরে আরেকটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এসব প্রস্তাব ও সুপারিশ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। সেই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সরকারকে সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে। এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনী থেকে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া ১৪১ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। এ নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। কমিটি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে। কমিটি ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত পদ্ধতিগত বৈষম্য ও পেশাগত ক্ষতির অভিযোগে অবসরপ্রাপ্ত, অপসারিত বা বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের করা আবেদন পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেয়।

আওয়ামী লীগ বৈষম্য-নিপীড়ন, দলবাজি থেকে কেবল রাজনীতি-সমাজ-প্রশাসন নয়; বিভিন্ন বাহিনীসহ রাষ্ট্রের কোনো সেক্টরকেই রেহাই দেয়নি। সিভিল পর্যায়ে এর ছাপ এক রকম। প্রতিরক্ষায় আরেক। তিন বাহিনীতে এর শিকাররা দম-নিঃশ্বাস বন্ধ করে ধুকরে ধুকরে ভোগে। লাজ-লজ্জায় গোপনও রাখে। আড়ালে-আবডালে কাঁদে, গোপনে চোখ মোছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তারা প্রস্তুত থাকে, তাই বলে অপমান-অপদস্তের জন্যও কি প্রস্তুত থাকে বা থাকতে হয়? এমন আঘাত যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় নিয়োজিতদের জন্য কতো বেদনার ভুক্তভোগীরাই জানে।

বিশেষ করে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত। তারওপর বাড়তি কাজ হিসেবে চব্বিশের গণআন্দোলন পরবর্তীতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যে ভূমিকা রাখতে হয়ছে তা কেবল দেশে নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে। দলীয়পনা, বৈষম্য চালাতে গিয়ে বিগতরা ভাবেনই সেনাবাহিনীকে হেয় করার ষড়যন্ত্র জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের সেনাবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেয়া এই বাহিনী শুধু দেশের সীমানা রক্ষা করেনি, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জনগণের পাশে দাঁড়ানো তাদের মজ্জাগত।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। সেই সেনাবাহিনীটিকেই নিশানা করতে তাদের বিবেক কাঁপেনি।
দুঃখজনকভাবে মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীকে খোঁচা দেয়া, বিরক্ত-উত্তেজিত করার ক্রিয়াকর্ম এখনো রয়েছে। তাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ সেøাগান ও অবমাননাকর মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য দেশের ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার নোংরা ষড়যন্ত্র চলছে। এরা কারা? উত্তর স্পষ্ট যারা রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়, যারা অবৈধ অস্ত্রের জোরে ক্ষমতার ভাগ চায়। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের মানুষও জানে, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই বাহিনীকে নিয়ে রাজনীতি করলে বা কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে তা দেশের স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এর উদাহরণ অনেক। যেসব দেশে সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা নষ্ট করা হয়েছে, সেসব দেশ দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। আফগানিস্তান, সোমালিয়া কিংবা সুদানের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার পরিণতি কতোটা ভয়াবহ। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে সেনাবাহিনীকে নিয়ে নানা রাজনৈতিক খেলা ও হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে ভয়াবহ পরিণতি নেমে এসেছিল। রাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে বারবার সেনাবাহিনীকে টানার এই ধরনের পরিণতি হিসেবে অতীতে সামরিক হস্তক্ষেপ, রক্তপাত, বাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেনাবাহিনীকে নিয়ে যারা অতি খেলেছেন তাদের পরিণতিও মানুষ দেখেছে। বাংলাদেশ সেনা, বিমান, নৌ ৩টি বাহিনীর ইতিহাসই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে তাদের গড়ে ওঠার সঙ্গে দেশ গঠনেও রেখে যাচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকা। ‘সমরে আমরা শান্তিতে আমরা, সর্বত্র আমরা, দেশের তরে’ এই মূলমন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সেবামূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আজ দক্ষ, অভিজ্ঞ, সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল, সুসংগঠিত ও আদর্শ একটি বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। অপমান-বৈষম্যের শিকার হলেও দেশ মাতৃকার বিরুদ্ধে যে কোনো অপচেষ্টা নস্যাতে তারা পিছপা হয় না। বিরত হয় না পেশাদারিত্ব ও যথাযথ দায়িত্ব পালনে। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগ আমলে বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার, প্রতিহিংসার শিকার সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর ১৫০ জনের বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপটি এ সময়ের অন্যতম একটি সেরা কাজ। বিশেষ বার্তাও।
যে বার্তায় স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ, সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সর্বদা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থে ব্যবহার না করে তাদের দেশের সংবিধান ও জনগণের প্রতি আনুগত্য পালনে প্রণোদিত করাই আসল কথা। দেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব ও অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা ও অঙ্গীকার উঠে এসেছে: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সব ধরনের বিতর্ক ও দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার কথা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অতীতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজনৈতিক স্বার্থে কখনোই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে না এবং তারাও সরাসরি রাজনীতিতে নাক গলাবেন না। আর বর্তমান সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তো খাস কথা বলে রেখেছেন সেই কবেই। কোনো দল বা গোষ্ঠী যেন সেনাবাহিনীকে প্রতিপক্ষ না ভাবে, নিজের পক্ষেও মনে না করে সেই আহ্বানের পাশাপাশি সাফ জানিয়ে রেখেছেন, ‘সেনাপ্রধান হিসেবে নিজের মেয়াদকালে আমি রাজনীতিতে নাক গলাবো না। আমি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করতে দেবো না। এটাই আমার স্পষ্ট অঙ্গীকার।’ এরপর আর কোনো কথা থাকে?

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট: ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন