একসময় মাকুর শব্দে মুখর ছিল উত্তরের নীলফামারীর সৈয়দপুর। এখন সেই ঐতিহ্য হারিয়ে বিলুপ্তির পথে তাঁতশিল্প। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও বিদেশি কাপড়ের প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে অধিকাংশ তাঁত। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক। টিকে থাকার লড়াই করছেন হাতেগোনা কয়েকজন তাঁতী। স্বাধীনতার আগে ও পরবর্তী সময়ে সৈয়দপুর শহরের গোলাহাট, কাজীহাট, হাতিখানাসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজারের বেশি পরিবার তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক এই শিল্পে কাজ করতেন। এখানকার গামছা, তোয়ালে, শাড়ি ও বেনারসি দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিল। এখানকার বেনারসির ব্যাপক চাহিদাও গড়ে উঠেছিল।
নীলফামারীর সৈয়দপুরের পার্শ্ববর্তী দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার রানীরবন্দর, সাতনালা, ভূষিরবন্দর, গছাহার, আলোকিডহি, বিন্যাকুড়ি এবং খানসামা উপজেলার গোয়ালডিহি, চন্ডীপাড়া ও কাচিনীয়া গ্রামসহ প্রায় অর্ধশত গ্রামের পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারও তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল ছিল। এসব এলাকার উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানের কারণে দেশ জুড়ে ছিল ব্যাপক চাহিদা। এই শিল্পকে ঘিরেই সৈয়দপুরে তাঁতশিল্পের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। অধিকাংশ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। যারা এখনো কাজ করছেন, তারাও উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। ফলে অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। দিন যত যাচ্ছে ততই কাজীহাট এলাকায় কমে আসছে তাঁতশিল্পের কাজ জানালেন তাঁতী মোহাম্মদ হারুন।
১৯৮৮ সাল থেকে এ পেশায় আছেন হারুন। আগে কাজীহাটের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে হ্যান্ডলুম ছিল, এখন আর একটি তাঁতও নেই। বর্তমানে তার ১০টি অটোলুমে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। আগে শাড়ি, গামছা ও বেনারসি তৈরি হলেও এখন রুমাল ও তোয়ালে উৎপাদন করছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামালের সরবরাহ এবং ভারতীয় কাপড়ের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে’- যোগ করলেন হারুন। একই অভিযোগের সুরে কথা বললেন তাঁতী মোহাম্মদ বদরু। বললেন, সুতার দাম বেড়েছে, চাহিদা কমেছে এবং উন্নত ফিনিশিং সুবিধার অভাবে স্থানীয় তাঁতশিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। সরকারি উদ্যোগে ক্যালেন্ডার মেশিন স্থাপন ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বেনারসি তাঁতী ময়িন জানান, একসময় সৈয়দপুরের বেনারসি শাড়ির ব্যাপক সুনাম ছিল। এ শিল্পের সঙ্গে পাঁচ হাজারের বেশি পরিবার জড়িত ছিল। বর্তমানে ভারতীয় শাড়ি ও লেহেঙ্গার বাজার বিস্তৃত হওয়ায় স্থানীয় বেনারসির চাহিদা অনেক কমে গেছে। কারিগর আনারুল ৩৫ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। অন্য কোনো কাজ জানেন না। দিনশেষে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। আগে রুমাল ও তোয়ালের চাহিদা বেশি থাকলেও টিস্যুর ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় রুমালের বাজার প্রায় হারিয়ে গেছে। ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প নানা সংকটে রয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সৈয়দপুর শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, সুতার মূল্যবৃদ্ধি এবং যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ব্যাপক সংকটে পড়েছে। শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
