সিলেটের গোয়াইনঘাটের মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস যেন দুর্নীতি লুটপাটের আঁতুড়ঘর। অফিসের কারও কারও বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি লুটপাটের পাশাপাশি মাধ্যমিকের সরকারি বই চুরির অভিযোগও রয়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অসুস্থতার সুযোগে অভিযুক্তরা মিলেমিশে চালাচ্ছেন অফিস। এদিকে বই চুরির ঘটনায় তথ্য অধিকার আইনে এ সংক্রান্ত তথ্য চাইলেও তাৎক্ষণিক সাংবাদিকদের তা সরবরাহ করা হয়নি। তবে ডাকযোগে একজন সাংবাদিকের আবেদনের প্রেক্ষিতে জানানো হয়েছে, বই চুরির কোনো তথ্য অফিসে নেই।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের ৩০শে জুলাই গোয়াইনঘাট মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের গুদাম ঘরে সংরক্ষিত অবশিষ্ট সরকারি বই চুরি করে বিক্রির চেষ্টাকালে সিলেটের কাজির বাজার থেকে একটি পিকআপে ভর্তি ৫ হাজার ৬৮৫টি বই উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পিকআপ চালক সিলেট সদর উপজেলার ওমাইরগাঁও এলাকার আনোয়ার মিয়াকে আটক করে। পরে তার দেয়া তথ্যমতে, গোয়াইনঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নিরাপত্তা প্রহরী শাহাব উদ্দিনকে আটক করে সিলেটের কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। এ ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই রাশেদ ফজল বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।
পরবর্তীতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই অঞ্জন কুমার দেবনাথ দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২৩ সালের ১৪ই মে মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেন। মামলার তদন্তে বই চুরির ঘটনায় জড়িত থাকায় পুলিশ গোয়াইনঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার শ্যামল কুমার রায়, অফিস সহায়ক (টাইপিস্ট) শংকর পদ পালকেও আসামি হিসেবে লিপিবদ্ধ করে আদালতে প্রতিবেদন দেয়। অভিযুক্তদের মধ্যে নাইটগার্ড শাহাব উদ্দিন ২৫ বছরের অধিক, শংকর পদ পাল ২৮ বছর ও একাডেমিক সুপারভাইজার শ্যামল রায় ১২ বছরেরও বেশি সময় থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে স্বপদে চাকরি করে আসছেন। দীর্ঘদিন থেকে অনিয়ম দুর্নীতির পাশাপাশি তাদের যোগসাজশে মাধ্যমিকের গুদামের সংরক্ষিত বই চুরির অভিযোগ রয়েছে। পুলিশি তদন্তেও অভিযোগ প্রমাণিত হযেছে।
এদিকে, গণমাধ্যমকর্মীরা বিষয়টি জানতে চাইলে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রদানে লুকোচুরির আশ্রয় নেয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস। এই প্রতিনিধি প্রথমে মৌখিক ও পরে তথ্য অধিকার আইনে গত ২১শে জানুয়ারি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর আবেদন করলেও কৌশলে এড়িয়ে যায়। তথ্য অধিকার আইনে আবেদনের দীর্ঘদিন পর গত ৬ই মে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রমাকান্ত দেবনাথ প্রেরিত একটি চিঠি এই প্রতিনিধির কাছে পাঠানো হয়। তাতে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে না থাকায় কোনো তথ্য প্রদান করা গেল না।
এলাকার সচেতন অভিভাবকরা বলছেন, গোয়াইনঘাট মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে কী এমন মধু আছে, যেখানে এক অফিসেই কেউ ২৮ বছর, কেউ ২৪ বছর, কেউ ১২ বছর ধরে পড়ে আছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, একাডেমিক সুপারভাইজার শ্যামল রায়, টাইপিস্ট শংকর পদ পাল সিন্ডিকেট উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গিলে খাচ্ছেন। তাদের খবরদারি ও দুর্নীতির আমলনামা বেশ পুরনো। বিদ্যালয়সমূহের জরুরি ফাইল চালাচালি কিংবা দাপ্তরিক হয়রানি করে এরা বছরের পর বছর জুড়ে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কাজ করে অঢেল কালো টাকার মালিকে পরিণত হচ্ছেন। জনশ্রুতি রয়েছে এই চক্রটির যোগসাজশে ২০২২ সালের বই চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
সূত্রটি আরও জানায়, একজন নিরাপত্তাপ্রহরী অফিসের অপরাপরদের সহযোগিতা ছাড়াই একা এমন চুরির ঘটনা ঘটাবে এমনটা বিশ্বাস হচ্ছে না। এ বিষয়ে কথা হলে টাইপিস্ট শংকর পদ পাল ও একাডেমিক সুপারভাইজার শ্যামল রায় বলেন, যেহেতু এ ঘটনায় আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বিচারাধীন, তাই এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না। দীর্ঘদিন একই অফিসে একই পদে বহাল থেকে লুটপাট, অনিয়ম, দুর্নীতি, শিক্ষকদের হয়রানি অবৈধ ইনকামে জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার রতন কুমার অধিকারী বলেন, বই চুরির ঘটনাটি ২০২২ সালের, যতদূর জানি এ বিষয়ে কোর্টে মামলা বিচারাধীন। বিষয়টি আদালতেই ফয়সালা করবেন। গোয়াইনঘাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের বই চুরির ঘটনায় কোতোয়ালি মডেল থানার জিআর ৫৭৪/২২ মামলাটি সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
