স্ত্রী মামলা করতে পারলেও স্বামী পাচ্ছে না কোনো প্রতিকার

ছিটমহলে আইনি জটিলতা

স্ত্রী মামলা করতে পারলেও স্বামী পাচ্ছে না কোনো প্রতিকার

ফন্ট সাইজ:

ছিটমহল বিনিময়ের ১১ বছর পরও পঞ্চগড় জেলার কোথাও কোথাও এখনো রয়ে গেছে আইনি জটিলতা। এ জটিলতায় পড়ে কেউ কেউ হয়রানি, ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে গেছে। সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের নারায়ণপুর মুন্সীপাড়া গ্রামের পাশেই ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত ছিট সাকাতি গ্রাম। কাগজে-কলমে এটি ভারতের অংশ হলেও দুই গ্রামের মাঝখানে নেই কোনো কাঁটাতারের বেড়া বা দৃশ্যমান বিচ্ছিন্নতা। সীমান্ত পিলার ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝার উপায় নেই কোথায় বাংলাদেশ শেষ আর কোথায় ভারত শুরু।

ছিট সাকাতি গ্রামের বাসিন্দারা অবাধে বাংলাদেশে যাতায়াত করেন। তাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়েও হচ্ছে বাংলাদেশি এলাকায়। পড়াশোনাও করছে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তারা নিজেদের নারায়ণপুর মুন্সীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিয়ে অনেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছে। আর এসব পরিচয়গত জটিলতা থেকেই তৈরি হচ্ছে নানা আইনি সমস্যাও। এমনই এক জটিলতার শিকার হয়েছেন সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের ছলিয়াপাড়া গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ২০১৩ সালে পরিচয় গোপন রেখে ভারতের ছিট সাকাতি গ্রামের আফরোজা সরকার সোনালীর সঙ্গে তার বিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের নিবন্ধন সম্পন্ন হয় পঞ্চগড় শহরের একটি কাজী অফিসে। বিয়ের পর তৌহিদুল জানতে পারেন তার স্ত্রীর প্রকৃত বাড়ি ভারতের অভ্যন্তরে। দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। পরে পারিবারিক কলহের জেরে আফরোজা বাবার বাড়িতে চলে যান। দীর্ঘদিন ফিরে না আসার জন্য ২০১৭ সালের ৬ই জুলাই পঞ্চগড়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে স্ত্রী ও সন্তান উদ্ধারের মামলা করেন তৌহিদুল। মামলায় আফরোজার ভাই আশরাফ আলী সরকার রুবেলসহ ৫ জনকে বিবাদী করা হয়। কিন্তু মামলার সমন জারি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় আদালত।

জারিকারক আদালতকে লিখিতভাবে জানায়, নারায়ণপুর মুন্সীপাড়ায় আশরাফ আলী সরকার রুবেল নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে মামলাটি কার্যত আর এগোয়নি। তৌহিদুল ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুই কন্যা সন্তানকে ফিরে পেতে পারিবারিক জজ আদালতে নতুন মামলা করেন। কিন্তু এবারও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। আদালতের জারিকারক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন ‘বিবাদীরা নারায়ণপুর মুন্সীপাড়ায় বসবাস করেন না। তারা ভারতের অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন। কিন্তু আফরোজা সরকার সোনালী বিভিন্ন সময় স্বামী তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে যৌতুক নিরোধ আইন, মোহরানা ও খোরপোশসহ নির্যাতনের পৃথক ৩টি মামলা করেন। মামলাগুলোতে নিজেকে বাংলাদেশের নারায়ণপুর মুন্সীপাড়ার বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি মামলায় তৌহিদুলকে কারাগারে যেতে হয়। আর একটি মামলায় আদালতের নির্দেশে তাকে স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে দিতে হয়। আফরোজা বিয়ের সূত্র ধরে স্বামীর ঠিকানায় বাংলাদেশের ভোটার হন। এ সুযোগটি মামলা করার ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছেন। ভুক্তভোগী তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমি দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। একের পর এক মামলায় পড়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমি এখন এই ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ চাই, আমার সন্তানদের ফিরে পেতে চাই। তারা ভারতে থাকলে আমি তাদের দেখতেও পারবো না।

তিনি বলেন, ভারতের ভূখণ্ডে বসবাস করেও বাংলাদেশের ঠিকানা ব্যবহার করে আদালতে মামলা করা সম্ভব হলেও একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার চাইতে গেলে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, ভারতের ওই এলাকার অনেকেই বাংলাদেশের নারায়ণপুর মুন্সীপাড়া এলাকার পরিচয় বহন করে। এ গ্রামটি এক সময় ছিটমহল ছিল। তখন অনেকেই বাংলাদেশের পরিচয়ে ছিল। বাংলাদেশেই চলাফেরা করতো। পরবর্তীতে তাদের কেউ কেউ হয়তো নাগরিকত্ব ধরে রেখেছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পঞ্চগড় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) এডভোকেট মেহেদী হাসান মিলন বলেন, সীমান্তবর্তী এসব এলাকার নাগরিক পরিচয়, ভোটার তালিকা ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের জটিলতা অনেকাংশে কমে আসবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন