পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌপথ, কোথাও দুর্গম পাহাড়ি সড়ক। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীকে কাঁধে, স্ট্রেচারে কিংবা নৌকায় করে হাসপাতালে আনতে হয় স্বজনদের। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসক। কারণ, রাঙ্গামাটির সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অনুমোদিত চিকিৎসকের প্রায় অর্ধেক পদই বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে। তবুও থেমে নেই চিকিৎসাসেবা। সীমিত জনবল, যন্ত্রপাতির ঘাটতি আর প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও প্রতিদিন হাজারো মানুষের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। তাদের এই লড়াই যেন পাহাড়ের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়েরই আরেক নাম।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, রাঙ্গামাটিতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩১১টি। এর মধ্যে কর্মরত মাত্র ১৫৮ জন। শূন্য রয়েছে ১৫৩টি পদ। অর্থাৎ প্রায় ৫০ শতাংশ চিকিৎসকের পদই খালি। অথচ এই জনবল দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে জেলার ১০টি উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে। ৬১ জন চিকিৎসকের অনুমোদিত পদের বিপরীতে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ২৩ জন। একই চিত্র লংগদু, জুরাছড়ি, বরকল, নানিয়ারচর, বিলাইছড়ি ও বাঘাইছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। বিশেষ করে জুরাছড়িতে ২৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে রয়েছেন মাত্র ৭ জন চিকিৎসক। লংগদুতে ২৮ পদের মধ্যে কর্মরত ৯ জন। বরকলে ২৬টির মধ্যে ১০ জন। নানিয়ারচরে ২৫টির মধ্যে ১১ জন।
এমন বাস্তবতায় একজন চিকিৎসককে অনেক সময় একাধিক বিভাগের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। তবে সংকটের মধ্যেও আশার খবর আছে। সীমিত জনবল নিয়েই চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়িয়েছে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতাল। বর্তমানে এখানে নিয়মিত জটিল সার্জারি হচ্ছে। হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মে মাসেই ৯৮টি মেজর জেনারেল সার্জারি, ৪৮টি মেজর অর্থোপেডিক সার্জারি, ৪১টি সিজারিয়ান সেকশন এবং ৮টি বড় গাইনিকোলজিক্যাল অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। জনবল সংকটের মধ্যেও এই সাফল্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা ও আন্তরিকতারই প্রমাণ। হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) বলেন, একসময় এটি ৫০ শয্যার হাসপাতাল ছিল। এখন প্রশাসনিকভাবে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। কিন্তু এখনো ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই হাসপাতাল চালাতে হচ্ছে। তিনি জানান, হাসপাতালে বর্তমানে গাইনি, সার্জারি, শিশু, চক্ষু, চর্মরোগ, নাক-কান-গলা, রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম, ডিজিটাল এক্স-রে, ইসিজি, ট্রোপোনিন-আই, থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট, প্যাপ স্মিয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে।
রয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম, পিএসএ অক্সিজেন প্ল্যান্ট ও আধুনিক ইনসিনারেটর। এদিকে হাসপাতালের নতুন ১১ তলা ভবনের ছয় তলার নির্মাণ শেষ হলেও এখনো চালু হয়নি আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিট। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এসব সুবিধা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। রাঙ্গামাটির সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা বলছেন, দুর্গম এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা, আবাসন সুবিধা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের নিশ্চয়তা না দিলে সংকট কাটবে না। অন্যথায় আধুনিক ভবন থাকবে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা অধরাই থেকে যাবে।
