পেটে ভাত না এলে জার্সির প্রেমে বিভোর হয়ে কী লাভ?

পতাকা নয়, প্রযুক্তির স্বপ্ন ওড়াক তরুণরা

পেটে ভাত না এলে জার্সির প্রেমে বিভোর হয়ে কী লাভ?

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন আরেকটি দেশে পরিণত হয়। দেশের ফুটবল নেই, বিশ্বমঞ্চে অংশগ্রহণ নেই, তবু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ঘিরে আবেগের বিস্ফোরণ। ছাদে ছাদে বিদেশি পতাকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্কের ঝড়, রাতভর খেলা দেখা, অফিসে ঘুম, ক্লাসে অনুপস্থিতি, এসব যেন আমাদের নতুন সংস্কৃতি। খেলাপ্রেম অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু যখন সেই ভালোবাসা বাস্তব জীবনকে গ্রাস করে, তখন সেটি আর বিনোদন থাকে না; হয়ে ওঠে আত্মপ্রবঞ্চনা।

এমন এক বাস্তবতায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ে উদ্ভাবক মো. সলেমান আলীর তৈরি সৌরচালিত সেচপাম্প উদ্বোধনকালে তিনি বলেন, "খালি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের লড়াই নিয়ে মেতে থাকলে লাভ হবে না। তাতে পেটে ভাত আসবে না। আসল কাজ হলো নিজেদের ও অন্য মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা।"

রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, এই বক্তব্যের সামাজিক তাৎপর্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ এটি কেবল ফুটবল নিয়ে মন্তব্য নয়; এটি বাংলাদেশের তরুণ সমাজের জন্য একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশে বিদেশি ফুটবল দলের সমর্থন অনেক ক্ষেত্রেই সুস্থ ক্রীড়াচর্চার সীমা ছাড়িয়ে উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালাগাল, বন্ধুদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি, এমনকি বিভিন্ন সময়ে খেলা নিয়ে সংঘর্ষ, আহত হওয়া এবং প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। বিদেশি দুই দলের জয়-পরাজয় নিয়ে এমন আবেগ পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখা যায়।

অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের লাখো তরুণ চাকরির অপেক্ষায়। কেউ দক্ষতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার জন্য জমি বিক্রি করছে, কেউ আবার উচ্চশিক্ষা শেষ করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে—আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি সত্যিই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল, নাকি বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়া?

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই জনমিতিক সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। এখনই যদি দক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ না করা যায়, তাহলে আগামী এক দশকেই এই সুযোগ হাতছাড়া হবে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বারবার বলছে, ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রোবোটিক্স, ডেটা বিশ্লেষণ এবং সৃজনশীল সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অপরিহার্য হয়ে উঠবে। শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই হবে আগামী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় মুদ্রা।

এ কারণেই ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্ভাবক মো. সলেমান আলীর গল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাজধানীর কোনো গবেষণাগার নয়, প্রত্যন্ত গ্রামের একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সৌরশক্তিনির্ভর সেচপাম্প তৈরি করেছেন। বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কম খরচে কৃষকদের সেচ সুবিধা দেওয়ার এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও বিশ্বমানের উদ্ভাবন করতে পারে।

এ ধরনের উদ্ভাবন শুধু একটি যন্ত্র নয়; এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এটি শেখায়, অভিযোগ নয় সমাধান খুঁজতে হবে। আমদানি নয়, নিজেদের প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে। ভোগ নয়, উৎপাদন বাড়াতে হবে।

বিশ্বের যেসব দেশ আজ উন্নত অর্থনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা ক্রীড়াপ্রেমী ছিল, এখনও আছে। কিন্তু তারা কখনো খেলাকে উন্নয়নের বিকল্প বানায়নি। দক্ষিণ কোরিয়া গবেষণায় বিনিয়োগ করেছে, চীন প্রযুক্তিতে, সিঙ্গাপুর মানবসম্পদে, ভিয়েতনাম দক্ষতা উন্নয়নে। তারা বিদেশি দলের পতাকা উড়িয়ে নয়, নিজেদের উদ্ভাবন দিয়ে বিশ্ববাজার দখল করেছে।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও সেই সামর্থ্য আছে। দেশের অসংখ্য তরুণ আজ আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে কাজ করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা করছেন, স্টার্টআপ গড়ছেন, কৃষিতে প্রযুক্তি আনছেন। কিন্তু এই সংখ্যাটি আরও অনেক বড় হতে পারত, যদি আমাদের সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকত উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা এবং গবেষকেরা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, একটি বিদেশি দলের জার্সি পরে ছবি দিলে যত আলোচনায় আসা যায়, নতুন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেও অনেক সময় ততটা আলোচনায় আসা যায় না। এ মানসিকতা বদলাতে হবে। আমাদের সন্তানদের মুখে শুধু মেসি, নেইমার, এমবাপ্পের নাম নয়; একই সঙ্গে দেশের বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাদের গল্পও পৌঁছে দিতে হবে।

খেলা অবশ্যই থাকবে। খেলাধুলা মানুষের সুস্থতা, শৃঙ্খলা ও সৌহার্দ্য শেখায়। একটি ম্যাচের জন্য রাত জাগা যদি পরীক্ষায় ব্যর্থতার কারণ হয়, অফিসের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, কিংবা দক্ষতা অর্জনের সময় কেড়ে নেয়, তাহলে সেটি আর আনন্দ নয়; সেটি আত্মক্ষতির আরেক নাম।

আজকের পৃথিবীতে প্রতিযোগিতা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের মধ্যে নয়; প্রতিযোগিতা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জ্ঞান এবং উৎপাদনশীলতার মধ্যে। যে জাতি গবেষণায় এগিয়ে থাকবে, সেই জাতিই অর্থনীতিতে এগিয়ে থাকবে। যে দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষি প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদে বিনিয়োগ করবে, ভবিষ্যৎ তারই হবে।

বাংলাদেশের তরুণদেরও তাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি সারাজীবন অন্য দেশের সাফল্য উদযাপন করবে, নাকি নিজের দেশের সাফল্যের ইতিহাস লিখবে?

আমাদের ছাদে বিদেশি পতাকা ওড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কার জন্ম নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল বিতর্কের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন উদ্যোক্তার জন্ম। শুধু রাতভর ম্যাচ দেখাই নয়,  বেশি প্রয়োজন নতুন প্রযুক্তি শেখা। কারণ পতাকা আবেগের পরিচয় দেয়, কিন্তু প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ গড়ে।

বাংলাদেশের আগামী দিনের শক্তি কোনো বিদেশি দলের গোল নয়; সেই শক্তি লুকিয়ে আছে লাখো তরুণের মেধা, শ্রম, উদ্ভাবন এবং স্বপ্নে। সেই স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

আমাদের ছাদে বিদেশি পতাকা ওড়ানোর চেয়ে বেশি জরুরি গবেষণাগারে নতুন আবিষ্কার জন্ম নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফুটবল বিতর্কের চেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন উদ্যোক্তার জন্ম। রাতভর ম্যাচ দেখার চেয়ে বেশি প্রয়োজন নতুন প্রযুক্তি শেখা। কারণ পতাকা আবেগের পরিচয় দেয়, কিন্তু প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ গড়ে।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ একাধিক ভাষণে বারবার বলেছেন, একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষা, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগের ওপর। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যুগে বিজ্ঞান, গণিত ও আধুনিক জ্ঞানকে অগ্রাধিকার না দিলে কোনো জাতিই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

বাংলাদেশের জন্যও বার্তাটি একই। আমরা আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সমর্থক হতে পারি, কিন্তু আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না মেসি বা নেইমারের কোনো গোল। তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে তারা কতটা দক্ষ, কতটা উদ্ভাবনী এবং কতটা প্রযুক্তিনির্ভর।

খেলা আনন্দ দিক, কিন্তু উদ্ভাবন জীবন গড়ুক। আবেগ থাকুক মাঠে, আর মেধা জয় করুক বিশ্ব। সেটিই হোক নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন