বাংলাদেশে কেন আর্জেন্টিনা নিয়ে এত উন্মাদনা

ম্যারাডোনা থেকে মেসি

বাংলাদেশে কেন আর্জেন্টিনা নিয়ে এত উন্মাদনা

ফন্ট সাইজ:

বিশাল পর্দার সম্প্রচার শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু হাজারো সমর্থকের কণ্ঠে তখনো ধ্বনিত হচ্ছে, ‘আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা! মেসি! মেসি!’ চারদিকে বেজে চলেছে ভুভুজেলা। পুরো এলাকা যেন আকাশি-সাদা রঙের সমুদ্র। কয়েক মুহূর্ত আগেই আর্জেন্টিনার প্রাণভোমরা লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছেন। বিশাল পর্দায় খেলা দেখা তরুণরা আর্জেন্টিনার পতাকা গায়ে জড়িয়ে একে অপরের কাঁধে উঠে নাচছেন, গাইছেন, আর শেষ বাঁশির অনেক পর পর্যন্ত উদ্‌যাপন চালিয়ে যাচ্ছেন। দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে এটি বুয়েন্স আয়ার্সের কোনো রাস্তা। কিন্তু বাস্তবে এটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। আর্জেন্টিনার রাজধানী থেকে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরে।
বাংলাদেশ কখনোই ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তবু প্রতি চার বছর পরপর আর্জেন্টিনা মাঠে নামলেই দেশের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা উৎসবে মেতে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আবাসিক এলাকায় বসে বড় পর্দা, অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সারারাত ধরে খেলা দেখার আয়োজন হয়, আর রাস্তাঘাট ভরে যায় আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রঙে।

ম্যারাডোনার হাত ধরেই শুরু: ঢাকার ৫০ বছর বয়সী আবদুল হাই’র কাছে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসার শুরু অবশ্য মেসিকে দিয়ে নয়। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের সময়ই তিনি দলটির প্রেমে পড়েন। হাই বলেন, আমি ১৯৮৬ সালেই ম্যারাডোনার প্রেমে পড়েছি। তখন আমি খুব ছোট ছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে দেখেছি, মানুষ কীভাবে তাকে নিয়ে পাগল হয়ে যাচ্ছিল। তার খেলার ধরন, আবেগ, দক্ষতা- এমনকি ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলটিও। সবকিছুই আমাদের মুগ্ধ করেছিল। তিনি আমাদের কাছে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন।

আর্জেন্টিনাকে এরপর আরও ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হয় বিশ্বকাপ জয়ের জন্য। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। হাই বলেন, অপেক্ষাটা সার্থক ছিল। মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি দেখার পর ফুটবল নিয়ে আর কোনো আক্ষেপ নেই।

১৯৮৬-ই ছিল মোড় ঘোরানোর বছর: বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, আবদুল হাইয়ের গল্পই আসলে বাংলাদেশের অধিকাংশ আর্জেন্টিনা সমর্থকের গল্প। মানিক বলেন, আমার দেখা মতে, সবকিছুর শুরু ১৯৮৬ সালে। ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডকে হারানো এবং এরপর ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ জয়। এই দু’টি ঘটনা সব বদলে দেয়। ম্যারাডোনার অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা ধীরে ধীরে আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে ওঠেন। তার মতে, ব্রাজিলের সমর্থক তখনো প্রচুর ছিল। কারণ তাদের একাধিক বিশ্বকাপ এবং কিংবদন্তি ফুটবলার ছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে ব্রাজিলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তার আগে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ ব্রাজিলকে সমর্থন করতো। ১৯৮৬ সালের পর আর্জেন্টিনাও শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করতে শুরু করে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার হার এবং ম্যারাডোনার কান্না বাংলাদেশের মানুষের আবেগকে আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। ম্যারাডোনা যখন ট্রফি জিততে পারলেন না এবং ফাইনালের পর কেঁদেছিলেন, তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও আবেগাপ্লুত হয়েছিল। এরপর থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থন স্থায়ী রূপ পায়।

ফুটবল থেকে কূটনীতি: বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা ঢাকার বিভিন্ন পাবলিক স্ক্রিনিংয়ে সমর্থকদের সঙ্গে বসে খেলা দেখেন এবং আর্জেন্টিনার জয় উদ্‌যাপন করেন। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা-উন্মাদনা বিশ্ব জুড়ে আলোচনার জন্ম দিলে ২০২৩ সালে বুয়েন্স আয়ার্স সরকার ঢাকায় ৪৫ বছর পর আবার দূতাবাস চালু করে। ১৯৭৮ সালে সামরিক সরকারের সময় বাজেট সংকোচনের কারণে দূতাবাসটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যদিও দূতাবাস পুনরায় চালুর পেছনে বাণিজ্য ও কূটনৈতিক স্বার্থও ছিল, দুই দেশের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, ফুটবল দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নতুন প্রজন্মের নায়ক মেসি: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনার চেয়ে মেসির আকর্ষণ অনেক বেশি। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী দ্বীন ইসলাম বলেন, ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি। বিশেষ করে মেসির জন্য। আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে ঢাকায় সমর্থকদের ‘ওয়েলকাম র?্যালি’তে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। তার চারপাশে তখন সমর্থকরা ঢাক বাজাচ্ছেন, বিশাল আর্জেন্টিনা পতাকা ওড়াচ্ছেন এবং বৃষ্টিভেজা রাস্তায় গান গাইতে গাইতে এগিয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই পরিবার থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়ার উত্তরাধিকার পেয়েছেন। মোহাম্মদ জহির বলেন, আমার বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক ছিলেন। আমিও সেই সমর্থন উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। পরে নিজে ফুটবল বুঝতে শুরু করি এবং তাদের খেলার প্রেমে পড়ে যাই।

রাত ৪টার ম্যাচ, তবু ঘুম নেই: ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় বাংলাদেশের সময় অনুযায়ী অনেক ম্যাচই গভীর রাতে হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান অর্জনের পর আর্জেন্টিনা শেষ ৩২-এর ম্যাচে কেপ ভার্দের মুখোমুখি হবে, যা বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় শুরু হবে। কিন্তু এতে সমর্থকদের উৎসাহ কমেনি। জহির হাসতে হাসতে বলেন, আমার অ্যালার্মের দরকার হয় না। আর্জেন্টিনা খেললে আমি নিজেই ঘুম থেকে উঠে যাই।

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল বিভাজন: ক্রীড়া সাংবাদিক ও ভাষ্যকার শাহানুর রাব্বানী মনে করেন, বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জনপ্রিয়তার মূল কারণ এই দুই দলের কিংবদন্তি ফুটবলাররা। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দক্ষিণ আমেরিকার এই দু’টি দলই ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়েছে। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বহুবার বিশ্বকাপ জিতেছে। ম্যারাডোনা থেকে রোনালদো, রিভালদো, আর এখন মেসি ও নেইমার- সব সময়ই এমন তারকা ছিল, যারা মানুষকে এই দলগুলোর দিকে আকৃষ্ট করেছে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ নায়ককে ভালোবাসে। এটি দলীয় খেলা হলেও তারা একজন নায়ক খুঁজে নিতে পছন্দ করে।

একই পরিবারে দুই শিবির: বাংলাদেশে অনেক পরিবারেই ফুটবল সমর্থন নিয়ে বিভক্তি রয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আইমান ব্রাজিলের সমর্থক। কিন্তু আর্জেন্টিনার র?্যালিতে এসেছেন বড় ভাইয়ের জোরাজুরিতে। তার বড় ভাই সালমান, অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। তিনি বলেন, বাড়িতে আমাদের মাঝে মাঝে তর্ক হয়। বাবা আর্জেন্টিনার সমর্থক, আর মা ব্রাজিলের। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বড় পর্দায় মেসির হ্যাটট্রিক উদ্‌যাপনের সময়ও সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চোখে পড়ে। আর্জেন্টিনার জার্সির ভিড়ে এক ব্রাজিল সমর্থক কিশোরকে বন্ধুরা মজা করে বলছিল, ‘সে তো বলেছিল ম্যাচ ড্র হবে!’

র‍্যালীতে উপস্থিত ছিলেন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী জুবাইদা ইসলাম জেরিন। তিনি গর্বের সঙ্গে তার পোষা বিড়ালটিকে পরিচয় করিয়ে দেন, যার গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি। বিড়ালের নামও মেসি। প্রথম বর্ষের কলেজশিক্ষার্থী সৈকত হাসান বলেন, মেসির হ্যাটট্রিক দেখা সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি। তার বন্ধু মাহির আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এবার বিশ্বকাপ আমাদেরই।

বাংলাদেশ কি কখনো বিশ্বকাপে খেলবে?: কিন্তু ‘আমাদের’ বলতে কী বোঝায়- এই প্রশ্নই ভাবায় সাংবাদিক শাহানুর রাব্বানীকে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ফুটবলকে এত ভালোবাসলেও সেই আবেগ কেন দেশের ফুটবলে সাফল্যে রূপ নেয়নি? বর্তমানে ফিফা পুরুষ র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। মানুষের এই উচ্ছ্বাস দেখে আমার খুব ভালো লাগে। কিন্তু একই সঙ্গে কষ্টও হয়। এত আবেগ থাকার পরও আমাদের ফুটবল এবং সামগ্রিক ক্রীড়া কাঙিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, সমস্যার মূল কারণ অবকাঠামো ও পরিকল্পনার অভাব। পর্যাপ্ত মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র কিংবা একাডেমি নেই। তরুণদের খেলোয়াড় হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পথও নেই। মানুষের আগ্রহ আছে, খেলতে চায়, কিন্তু কীভাবে এগোবে তা অনেকেই জানে না। সাবেক কোচ শফিকুল ইসলাম মানিকও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এক সময় আমাদের ভালো খেলোয়াড় ছিল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়নি। তরুণরা কালই বাংলাদেশকে বিশ্বকাপে দেখতে চায় না। তারা শুধু একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এবং ফুটবলকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে দেখতে চায়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন