উত্তরাধিকার হিসেবে নারীর অধিকার নিয়ে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

ফন্ট সাইজ:

৭১ বছর ধরে চলা একটি পারিবারিক উত্তরাধিকার বিরোধের নিষ্পত্তি করে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে। তারা বলেছে, উত্তরাধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি শরিয়াহ (ইসলামী আইন) ও দেশের আইনে স্বীকৃত একটি অর্জিত অধিকার। পরিবারের প্রধানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই নারীসহ সব বৈধ উত্তরাধিকারীর মধ্যে এই অধিকার কার্যকর হয়। আদালত আরও বলেছেন, ব্যক্তিগত সমঝোতা, সামাজিক চাপ, সন্দেহজনক ভূমি রেকর্ড বা বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত কৌশলের মাধ্যমে এই অধিকার খর্ব করা যাবে না। দুই বিচারকের বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতি শাহিদ বিলাল হাসান লাহোর হাইকোর্টের বাহাওয়ালপুর বেঞ্চের ২০১৭ সালের ২৬শে জানুয়ারির রায় বাতিল করে বলেন, উত্তরাধিকার কোনো দান নয়, যা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ইচ্ছামতো দেয়া বা না দেয়া যাবে। এটি এমন কোনো ছাড়ও নয়, যা প্রথা, সুবিধা বা পারিবারিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

১৯৫৫ সালে শুরু হওয়া বিরোধ
মামলার সূত্রপাত ১৯৫৫ সালে। ওই বছর মামলার সম্পত্তির মালিক রোশন মারা যান। এরপর ৪ঠা এপ্রিল উত্তরাধিকার মিউটেশন নম্বর ৭৪-এর মাধ্যমে তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের নামে সম্পত্তি নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু একই দিনে মিউটেশন নম্বর ৭৫-ও রেকর্ড করা হয়। এতে দাবি করা হয়, রোশনের স্ত্রী ও কন্যারা মৌখিকভাবে তাদের সম্পত্তির অংশ মৃতের দুই ছেলেকে উপহার দিয়েছেন। আবেদনকারীরা আদালতে দাবি করেন, এমন কোনো উপহার কখনোই দেয়া হয়নি। বরং নারী উত্তরাধিকারীদের আইনগত অংশ থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রতারণার মাধ্যমে মিউটেশন নম্বর ৭৫ অনুমোদন করানো হয়েছিল। পরবর্তীতে দুই ছেলে ও তাদের উত্তরসূরিরা সম্পত্তির দখল ধরে রেখে বিনিময় ও দানপত্রের মাধ্যমে তা নিজেদের বংশধরদের কাছে হস্তান্তর করেন। এ অবস্থায় আবেদনকারীরা আদালতে মামলা করে মিউটেশন নম্বর ৭৫-কে অবৈধ ঘোষণার আবেদন জানান। বিচারিক আদালত মামলা খারিজ করে দেন। পরে আপিল আদালত এবং লাহোর হাইকোর্টও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়
সুপ্রিম কোর্ট আবেদন মঞ্জুর করে মিউটেশন নম্বর ৭৫-কে অবৈধ, বাতিল এবং আবেদনকারীদের উত্তরাধিকার অধিকারের বিরুদ্ধে অকার্যকর ঘোষণা করেছেন। আদালত বলেছেন, উত্তরাধিকার আইনের আলোকে আবেদনকারীরা রোশনের সম্পত্তিতে তাদের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার অধিকারী। একই সঙ্গে রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে ভূমি রেকর্ড সংশোধন এবং আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ ও পৃথক করার নির্দেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি শাহিদ বিলাল হাসান বলেন, উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির সময় আদালত ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আইন নারীদের উত্তরাধিকার অধিকার রক্ষার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছে। তার মতে, কোনো লেনদেনের মাধ্যমে যদি কোনো নারী উত্তরাধিকারীকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে সেটিকে অত্যন্ত সতর্কতা ও কঠোর বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে। রায়ে আরও বলা হয়েছে, কোনো কথিত উপহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, সেই লেনদেন আইনসম্মত ছিল- এটি প্রমাণ করার দায়িত্ব উপকারভোগীদের ওপরই বর্তাবে।

ইসলামী আইনে উত্তরাধিকারের বিশেষ গুরুত্ব
সুপ্রিম কোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেছেন, ইসলামী আইন শাস্ত্রে উত্তরাধিকার আইনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। কারণ এটি সম্পদ বণ্টনের আল্লাহর নির্ধারিত বিধান এবং পরিবার ও সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। রায়ে বলা হয়েছে, আজও বহু নারী ভুয়া উপহারের দাবি, জাল ভূমি রেকর্ড, প্রতারণামূলক অধিকার ত্যাগের নথি, পারিবারিক চাপ এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাদের বৈধ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিচারপতি শাহিদ বিলাল হাসান বলেন, এ ধরনের বিরোধের স্থায়িত্ব কেবল আইনি সমস্যার প্রতিফলন নয়, এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যাও। তিনি বলেন, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রক্রিয়া প্রায়ই পরিবার ও সমাজ থেকেই শুরু হয়। সেখানে নারীদের ধর্ম ও আইনে নিশ্চিত অধিকার ত্যাগ করতে বলা হয় পারিবারিক ঐতিহ্য, সম্মান বা সামাজিক সুবিধার নামে।

রায়ে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার অধিকার রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়। পরিবার, সমাজের নেতৃবৃন্দ, ধর্মীয় আলেম, আইনজীবী, রাজস্ব কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব হলো মহান আল্লাহ প্রদত্ত অধিকার যেন কোনোভাবেই খর্ব বা অস্বীকার না হয়, তা নিশ্চিত করা। বিচারপতি শাহিদ বিলাল হাসান বলেন, যে সমাজ একদিকে ন্যায়বিচারের প্রশংসা করে, অন্যদিকে নারীদের বৈধ উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নেয়, সেই সমাজ এমন এক সাংঘর্ষিক অবস্থার মধ্যে রয়েছে, যা সংবিধানের মূল্যবোধ কিংবা ইসলামি নীতিমালার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি আরও বলেন, একটি আইনি ব্যবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন হয় সে কতোটা কার্যকরভাবে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে, তার ওপর।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন