দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে জাতীয়করণ হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও পদোন্নতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে ২০১৩ সালের বিধিমালার বিতর্কিত বিধান বহাল রাখায় দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও নিয়োগে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না। সরকারের মতে, এই রায়ের ফলে শিক্ষকদের পদন্নোতি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার অবসান হয়েছে। একইসঙ্গে পদোন্নতির ফলে প্রায় ৪০ হাজার পদে নতুন নিয়োগ দেয়া যাবে। এদিকে মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে এবং হাজার হাজার শূন্যপদ দ্রুত পূরণের পথ খুলে গেল। গতকাল প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ৪ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সরকারের করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের ২০১৯ সালের রায় বাতিল করেন। এর ফলে ‘অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ) বিধিমালা, ২০১৩’-এর ৯(১) ধারা বহাল থাকলো। ওই ধারায় বলা হয়েছে, সরকারিকরণ হওয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার অবস্থান হবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সর্বশেষ শিক্ষকের নিচে।
যেভাবে শুরু হয় বিরোধ: বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এনজিও বা স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরে ১৯৭৪ সালের ‘টেকিং ওভার’ আইনের আওতায় সরকার ধাপে ধাপে এসব বিদ্যালয় অধিগ্রহণ বা সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালের ১লা জানুয়ারি ২৬ হাজারের বেশি নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হয় এবং সেসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সরকারি চাকরিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর তাদের চাকরির শর্ত নির্ধারণে সরকার ২০১৩ সালে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করে। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত নিয়ে ওই বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়। তবে একই বিধিমালার ৯(১) ধারায় বলা হয়, জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের অবস্থান হবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষকদের পরে। এই বিধানকে চ্যালেঞ্জ করে ৩৮৩ জন এবং পরবর্তীতে আরও ৩৭৮ জন যোগ হয়ে মোট ৭৬১ জন শিক্ষক হাইকোর্টে রিট করেন।
হাইকোর্টের রায় থেকে আপিল বিভাগ: ২০১৯ সালের ১১ই মার্চ হাইকোর্ট শিক্ষকদের পক্ষে রায় দিয়ে বিধিমালার ৯(১) ধারার সংশ্লিষ্ট অংশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এরপর সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষ আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করে। ২০২২ সালের ২০শে নভেম্বর আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে জ্যেষ্ঠতা ও পদসংক্রান্ত বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। গত ১৮ই জুন শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায়ে আপিল বিভাগ সরকারের আপিল মঞ্জুর করেন এবং হাইকোর্টের রায় বাতিল করেন। ফলে ২০১৩ সালের বিধিমালার ৯(১) ধারা বহাল থাকে।
আইনজীবীরা যা বলছেন: সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী রমজান আলী শিকদার মানবজমিনকে বলেন, সরকার ২০১৩ সালে যে বিধিমালা প্রণয়ন করেছিল, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল ১লা জানুয়ারি ২০১৩ সালের আগে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জ্যেষ্ঠতায় অগ্রাধিকার পাবেন এবং সরকারিকরণ হওয়া বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের পরে অবস্থান করবেন। হাইকোর্ট সেই বিধান বাতিল করলেও আপিল বিভাগ সরকারের অবস্থান বহাল রেখেছেন। তিনি বলেন, আদালত একইসঙ্গে পর্যবেক্ষণে স্থানীয়ভাবে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেয়া নিয়োগকে সরকার অনুমোদন করে না বলেও উল্লেখ করেছেন। দীর্ঘদিন মামলা চলমান থাকায় প্রায় এক লাখ সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকের পদোন্নতি ও চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম স্থবির হয়েছিল। নতুন রায়ের ফলে সেই জটিলতা দূর হবে এবং নিয়মানুযায়ী যোগ্য শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির সুযোগ পাবেন। এদিকে, মামলাটির আরেক আইনজীবী ব্যারিস্টার হাবিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, আপিল বিভাগের রায়ে সরকারের প্রণীত গেজেট ও বিধিমালার বৈধতা বহাল রাখা হয়েছে। ফলে সরকারিকরণ হওয়া শিক্ষকরা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি শিক্ষকদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারবেন না। তবে সরকারিকরণের আগে বেসরকারি বিদ্যালয়ে চাকরির অর্ধেক সময় পেনশন, গ্র্যাচুইটি, সিলেকশন গ্রেডসহ আর্থিক সুবিধা নির্ধারণে গণনা করা হবে। তার মতে, এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউয়ের সুযোগ থাকলেও তা খুবই সীমিত।
সরকারের প্রতিক্রিয়া: রায়ের পর সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, ২০১৭ সালে ৩৮৩ জন শিক্ষক চাকরিকালের ৫০ শতাংশ জ্যেষ্ঠতা গণনার দাবি জানিয়ে মামলা করেছিলেন। ২০১৯ সালে হাইকোর্টের রায়ের পর প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি কার্যক্রম আটকে যায় এবং দীর্ঘ সময় তা নিষ্পত্তি না হওয়ায় সারা দেশে পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আপিল শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অ্যাটর্নি জেনারেল বিষয়টি তদারকি করেন এবং আপিল বিভাগ সরকারের আপিল মঞ্জুর করেছেন। বর্তমানে দেশের ৮৫ হাজার ৫০০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আপিল বিভাগের রায়ের ফলে এখন এসব পদে পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হবে। একইসঙ্গে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির ফলে সহকারী শিক্ষকের ৩৮ হাজার ৪৪৩টি পদ শূন্য হবে, যেখানে নতুন নিয়োগ দেয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় মন্ত্রী আরও জানান, এর আগে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষককে শিগগিরই প্রশিক্ষণে পাঠানো হবে। প্রচলিত ৯ মাসের পরিবর্তে প্রাথমিকভাবে দুই মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে দ্রুত বিদ্যালয়ে যোগদানের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা যায়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রায় ৩৬ হাজার বিদ্যালয় দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক ছাড়া পরিচালিত হওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সেই অচলাবস্থা দূর হয়েছে। তিনি এ রায়কে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় স্বস্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
এদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেয়া অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে সরকারের আপিল মঞ্জুর করেছেন। ফলে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে যে আইনি বাধা ছিল, তা সম্পূর্ণ দূর হয়েছে এবং এখন মন্ত্রণালয় দ্রুত পদোন্নতি ও নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
