জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, ২০২৬-এর খসড়া আইনে ১৯টি সংশোধনী সুপারিশ করেছে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ধারা-৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ১৩, ১৬, ২০, ৩১, ৩৬, ৪০সহ ১৯ জায়গায় সংশোধনের প্রস্তাব করেছে টিআইবি। খসড়া আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে জনবান্ধব করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ঢাকার টিআইবি কার্যালয়ে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবি পর্যালোচনা ও সুপারিশ বিষয়ক একটি পরামর্শ সভা আয়োজন করে। সভায় এইচআরএফবি’র অংশীদার বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় তারা সংখ্যালঘু, লিঙ্গ সমতাসহ অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে আইনের বিভিন্ন ধারায় পরিবর্তন প্রস্তাব করেন।
পরামর্শ সভায় নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার প্রণীত খসড়া অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পাস করা হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠন সম্ভব হবে না। সরকার নিয়ন্ত্রিত ও জনগণের ওপর একটি অকার্যকর মানবাধিকার কমিশন চাপিয়ে দেয়া হলে তা বর্তমান সরকারের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে বাংলাদেশের তুলনায় আরও কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী সরকার থাকলেও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এভাবে দলীয়করণ করে অকার্যকর করার নজির খুব কম। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই সরকার জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল না করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেবে বলে আশা করি। পরামর্শ সভায় টিআইবি জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ৯৭টি হুবহু এবং ১৩টি অধ্যাদেশ সংশোধনীসহ আইনে পরিণত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে কিছু অস্পষ্টতা থাকা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে অধিকতর যাচাই-বাছাই করে নতুনভাবে আইনটি প্রণয়ন করার যুক্তি দেখিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধসহ জনগুরুত্বপূর্ণ ১৬টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা হয়নি।
স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা; কমিশনের কার্যাবলী: অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্তের ক্ষমতা; শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার; অভিযোগ তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের এখতিয়ার; মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নেয়া; মধ্যস্থতা ও সমঝোতাকারীর নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতা নির্ধারণের প্রবিধান জারির এখতিয়ার; কমিশনার বাছাই কমিটি গঠন, চেয়ারপারসন ও কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়া; চেয়ারপারসন ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতা; কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ; কমিশন গঠনে বহুত্ববাধী প্রতিনিধিত্ব; কমিশনের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের এখতিয়ার; কমিশনের কার্যাবলী; কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা এবং বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা-শীর্ষক ধারাসমূহের পরিবর্তনের আহ্বান জানায় টিআইবি। টিআইবি বলছে, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে প্রতিনিধিত্বকারী বিএনপি’র নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকার সার্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে মানবাধিকার কমিশন গঠনের অঙ্গীকার করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জাতীয় আকাক্সক্ষা ও প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অনেকটা সঙ্গতিপূর্ণ বলে বিবেচিত হলেও তা সংসদে পাস করা হয়নি। টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে। তাছাড়া, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় কয়েকটি নতুন ধারা অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে উন্নততর সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর তুলনায় খসড়া ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এ কিছু উদ্বেগজনক তারতম্যের সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছে টিআইবি।
খসড়া আইনের ধারা ৩ (২)-এ ‘কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে যা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন থাকবে না’Ñএরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে; আইনের ধারা ১৩-তে ‘সকল আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য আটক স্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে এমন স্থানসমূহের নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা এবং এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা এবং এ সকল স্থান আইন বহির্ভূত হলে তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের নিকট সুপারিশ করার বিধান যুক্ত করতে হবে। ধারা ১৬-তে ‘অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য হলে তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্র মতো, কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না’-এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে বলে সুপারিশে তুলে ধরে টিআইবি।
খসড়ায় সংশোধিনীতে টিআইবি আরও জানায়, ধারা ১৮(৩)-এ মধ্যস্থতা ও সমঝোতাকারীর নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতা প্রবিধান দ্বারা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ‘সরকারের অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা’ সংবলিত বিধান বাতিল করতে হবে। আইনের কমিশনে কার্যাবলীর মধ্যে (ধারা ১৩)-মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত নাগরিক সমাজ বা এনজিও-এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা ও মানবাধিকার রক্ষা সম্পর্কিত শিক্ষা কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা সংক্রান্ত বিষয়গুলো যুক্ত করতে হবে। খসড়া আইনে কমিশনের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখার জন্য খসড়া আইনের ধারা ৪০ সংশোধন করে ‘এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, কমিশন, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, প্রবিধান প্রণয়ন করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, প্রবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত, কমিশন লিখিত আদেশ দ্বারা যে পদ্ধতি নির্ধারণ করবে, কমিশন তার কার্যনির্বাহের ক্ষেত্রে উক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করবে’ এরূপ ধারা যুক্ত করতে হবে বলেও সুপারিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
