ইরানের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা এখনো অটুট

আল জাজিরার প্রতিবেদন

ইরানের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা এখনো অটুট

ফন্ট সাইজ:

চার মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর কাতারের দোহায় আমেরিকার সঙ্গে মধ্যস্থতা আলোচনায় বসেছেন ইরানি কর্মকর্তারা। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের সামরিক শক্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দাবি করলেও তেহরান তার প্রতিরোধ ও অবাধ্যতা প্রদর্শন জারি রেখেছে। দোহায় এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন গত ১৭ই জুন যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে এরপরেও সীমান্তে সীমিত আকারে গোলাগুলি এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরুর হুমকি অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইল এই আলোচনার তীব্র বিরোধিতা করে যেকোনো সময় পুনরায় বড় মাত্রার বিমান হামলা শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ জানিয়েছেন, হামলার লক্ষ্যবস্তু ইতিমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে এবং গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুদ্ধে নিহত আলী খামেনির পর দায়িত্ব নেয়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাদের তালিকায় রয়েছেন। এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী পাল্টা আঘাত করা হবে।

হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে?: চল্লিশ দিনেরও কম সময়ের তীব্র সংঘাতের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে ১৩ হাজারেরও বেশি এবং ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রায় ৪ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডারদের পাশাপাশি তাদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড কেন্দ্র এবং পারমাণবিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান ব্র্যাড কুপার মে মাসে জানান, সমন্বিত হামলায় ইরানের ৮৫ শতাংশেরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা শিল্প ব্যবস্থা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি ইরানি নৌযান এবং ভারত থেকে নৌ-মহড়া শেষে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন সাবমেরিনের আঘাতে ডুবে যাওয়া ‘আইআরআইএস ডেনা’ যুদ্ধজাহাজটি অন্তর্ভুক্ত, যার ১৩৬ জন ক্রুর মধ্যে ১০৪ জনই নিহত হন। সামরিক খাতের পাশাপাশি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দাবি অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় ইরানের ৭০ শতাংশ ইস্পাত উৎপাদন ক্ষমতা এবং ৮৫ শতাংশ পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ছাড়া দেশটির তেল-গ্যাস ক্ষেত্র, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির ৯ কোটিরও বেশি মানুষ তীব্র মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।

কী অক্ষত রয়েছে?: এত বড় মাত্রার বোমাবর্ষণের পরেও ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে এবং দ্রুত তা পুনর্গঠন করছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) গ্রানাইট পাহাড়ের গভীরে খনন করা ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র নেটওয়ার্কের সিংহভাগই অক্ষত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি প্রায় ৯০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ স্থাপনা আবারো সচল করা হয়েছে। মে মাসের শেষের দিকে মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, ইরানের সামরিক বাহিনী ধারণার চেয়েও দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করছে এবং দেশটির একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন উৎপাদন যুদ্ধের পর থেকে প্রায় দশ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানি কমান্ডাররা জানিয়েছেন, মহাশক্তিধর দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের বাহিনীকে আরও যুদ্ধ-প্রস্তুত করে তুলেছে। যুদ্ধ চলাকালীন ইরান ‘আরাশ-ই কামানগির’ নামক একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমেরিকার অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-নাইন রিপার’ ড্রোনসহ প্রায় ২০০টি শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। এ ছাড়া তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মার্কিন এফ-থার্টিফাইভ ও এফ-ফিফটিনের মতো অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানকে আংশিক প্রতিহত করতে সক্ষম হয় এবং ইরানি যুদ্ধবিমানগুলো কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ক্যাম্পে সফল বোমাবর্ষণ করে। বড় যুদ্ধযান হারালেও ইরান তাদের ছোট ও দ্রুতগামী বোট এবং অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে বিশ্ববাজারে চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখে। সব পক্ষই জানিয়েছে, চলমান শান্তি আলোচনা যদি কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য চুক্তিতে রূপ না নেয়, তবে তারা যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে প্রস্তুত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন